স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রামে সফল নূরুন্নাহার

আর দশ জন নারীর মতোই স্বামী পরিত্যক্ত নূরুন্নাহার আবার বিয়ে করে সংসারী হতে পারতেন। সে বয়সও তার ছিলো তখন। কিন্তু তা করেননি নুরুন্নাহার। বাবা ও ভাইদের সংসারের বোঝাও হতে চাননি এই সাহসী নারী। ৪ বছরের ছেলে নাঈমকে কোলে নিয়ে শুরু করেন এক অন্যরকম জীবন সংগ্রাম। ৯৬ থেকে ২০১৩। ১৭ বছরের নিরলস সংগ্রামে নূরুন্নাহার এখন সফল এক নারীর নাম। নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে এলাকায় তার মতো অসহায় দুঃস্থ নারীদের পথ দেখাচ্ছেন স্বাবলম্বী হতে। গড়ে তুলেছেন মফস্বলের অচলায়তনে ফ্যাশন হাউজ। ২০ নারীর করেছেন কর্মসংস্থান। দারুণ সব নক্সা করা সুঁতির এপলিক পোশাক তৈরী করছেন।

চাটমোহর-পাবনা সড়কের পাশে উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের ভাদড়া স্কুলপাড়া গ্রামে নূরুন্নাহারের নিজের কেনা বাড়িতে গড়ে তোলেন নাঈম ফ্যাশন হাউজ নামে একটি ফ্যাশন হাউজ। জানালেন, ৯৬ সালে স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে শিশু সন্তান নাঈমকে নিয়ে বাবা জহের আলীর বাড়ীতে ফেরেন। ভাই-ভাবীর সংসারে সমস্যা দেখা দিলে টেলারিং এর কাজ শুরু করেন। ৯৮ সালে দর্জির কাজ করে জমানো টাকা দিয়ে ৬ শতক জমি কিনে পৃথক একটা বাড়ী করেন। ৪ বছর পরে ঢাকায় চলে যান। কুড়িলে টেলারিং কাজ শিখতে শুরু করেন। ২ বছর পরে কাজটা ভালো করে শিখে বাড়ী ফেরেন। ২০০৫ সালে একটা সেলাই মেশিন কিনে টেলারিং এর কাজ শুরু করেন। বাড়িবাড়ি গিয়ে জামা-কাপড়ের অর্ডার নিয়ে এসে কাজ করেন। এ সময়ই এলাকায় তার মতো নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণের চিন্তা মাথায় আসে তার।

নুরুন্নাহার নিজে কারো বোঝা না হয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পেরে গর্বিত। এরই সাথে তিনি এ পর্যন্ত ২৫০ নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছেন। এরপরও অদম্য নুরুন্নাহার থেমে থাকেননি। ভাবলেন, প্রশিক্ষন দেওয়া নারীদের নিয়ে একটা ফ্যাশন হাউজ করলে কেমন হয়। করে ফেললেন, ছেলের নামে নাঈম ফ্যাশন হাউজ। আছে ছেলের নিজেরও কাপড়ের দোকান। সে দোকানের কাপড় কিনেই শুরু হলো যাত্রা। সেই ফ্যাশন হাউজে এখন ১০ টা সেলাই মেশিন। এখন আর ২০ জন তার মতো নারী পোশাকে হাতের এপলিক ডিজাইন করার চাকরি করছেন ।নুরুন্নাহার আরো জনালেন, জয়গুন নামে একজন দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে গ্রামে গ্রামে নারীদের সেলাই শেখাতে উঠোন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছেন নামমাত্র (১০ টাকা) অর্থে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সারা পেয়েছি কিন্তু মেশিন সংকটে উঠোন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।

ফ্যাশন হাউজের কাজ সম্পর্কে নূরুন্নাহার জানান, মূলতঃ নারী ও শিশুদের পোশাক বানানো হয়। তাতে বিভিন্ন রংয়ের কাপড় শৈল্পিক ভাবে হাতে রেপলিক করে ডিজাইন করা হয়। আশপাশের উপজেলা সদরের গার্মেন্টস দোকানগুলোতে তার ছেলে নাঈম (২২) গিয়ে অর্ডার মতো সরবরাহ করেন।একটু পেছন ফিরে নুরুন্নাহার বলেন, ৮৬’ তে তার বাল্যবিয়ে হয়েছিলো। তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী তিনি। উদ্যোমী নুরুন্নাহার স্বামীর সংসার করেও লেখাপড়া চালিয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছেন।

নূরুন্নাহার স্বপ্ন দেখেন আরও অনেকদূরের। বলেন, ১০০ নারীর কর্মসংস্থান করতে চাই। ৫০টা মেশিন কিনতে চাই। এ্যামব্রয়ডারী, ব্লক, বাটিক এর কাজ করতে চাই। আর আমার কাজ ঢাকায় বাজারজাত করতে চাই। এ জন্য দরকার অর্থায়ন। প্রয়োজন সরকারী সহযোগিতা, সহজ শর্তে ঋন।নুরুন্নাহারের সংরাম আর সাফল্য প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, সত্যিই নুরুন্নাহার আলো ছড়াচ্ছেন সমাজে। তার জীবন সংগ্রাম অন্যন্য সাধারন। জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ- এ এবার তাকে উপজেলার শ্রেষ্ঠ ৫ জয়িতার একজন হিসাবে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তার মত নারীরাই যুগে যুগে সমাজ বদলে অবদান রেখেছেন।

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প