সংগ্রামী কিষানি জুলেখার সাফল্যগাথা

মাগুরার আলোকদিয়ার পুখরিয়া গ্রামের জুলেখা বেগম। যিনি জীবিকার তাগিদে ও সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়া স্বামীর সংসারের হাল ধরেন শক্ত হাতে। নারী-পুরুষের ভেদাভেদ ভুলে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে এমন কাজ নেই যে তিনি করেননি। জমিতে লাঙল দেওয়া, পাওয়ার টিলার চালানো, শ্যালো মেশিনের হাতল ঘোরানো, কোদাল দিয়ে মাটি কোপানো ও মাথায় ধান-পাটের বোঝা বহন, এমনকি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজেও তিনি সিদ্ধহস্ত।

নিজের জমিতে নিজের হাতে আবাদ করেন নানা রকম ফসল। মাঠে তার জমির ফসল সবার সেরা। কখন কোন ফসল আবাদ করতে হবে। কোন সার, কোন কীটনাশক দিতে হবে- সব তার জানা। বীজতলা থেকে শুরু করে জমি কর্ষণ করে চাষ উপযোগী করে তোলার জন্য যাবতীয় কাজ করেন তিনি। কারো কাছ থেকে পরামর্শ নেন না বরং প্রতিনিয়ত অন্য কৃষকেরা তার কাছ থেকে কৃষিবিষয়ক নানা পরামর্শ নিচ্ছেন। শুধু কী তাই? তিনি বেশি লেখাপড়া না শিখলেও তার ছেলেমেয়েরা সবাই আজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। নিজে আবার স্থানীয় একটি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দফতরির চাকরিও করেন।

আলোকদিয়ার পুখরিয়া গ্রামের সুরুজ মোল্লার মোটামুটি সচ্ছল সংসারে জন্ম জুলেখা বেগমের। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে তিনি বড়। ছোটবেলা থেকে বাবাকে টুকটাক কৃষিকাজে সহযোগিতা করতেন। বাবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লে সংসারের পুরো ভার তার কাঁধে এসে পড়ে। তিনি সংসারের হাল ধরেন। একসময় কামারখালীর ভেল্লাকান্দি গ্রামের নওয়াব আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সুখ বেশি দিন সইল না জুলেখার কপালে। দুই ছেলে আর এক মেয়ের সংসারে হঠাৎ করে স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যান। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। আবার ফিরে আসেন বাবার বাড়ি। ভাইবোন, তিন সন্তান আর বাবা-মা নিয়ে শুরু হয় জুলেখার নতুন জীবনসংগ্রাম।

 বাবার পাঁচ বিঘা ও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে নেমে পড়েন কৃষিকাজে। জমিতে ধান-পাট ও সবজিসহ নানা ফসল ফলান। মাঠে অন্য যে কারো খেতের ফসলের চেয়ে তার ফসলের ফলন ভালো হয়। গবাদিপশু পালনের পাশাপাশি খেত-খামারের যাবতীয় কাজ করেন নিজের হাতে।

জুলেখা বেগম জানান, এ বছর তিনি ৫০ মণ ধান ও ২০ মণ পাট উৎপাদন করেছেন। নানা রকম সবজি ও গরু-ছাগল বিক্রি করে এক লাখ টাকারও বেশি আয় করেছেন। তার উপার্জিত টাকায় ভাইদের সংসার গড়ে দিয়েছেন। এখন তার দুই ছেলে সিরাজ ও মিরাজ ফরিদপুর রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স পড়ছে। বড় মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজে পুখরিয়া-আলোকদিয়া বালিকা বিদ্যালয়ে দফতরির চাকরি করেন।

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প