মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গভিত্তিক (জেন্ডার) সমতা আনয়ন

জেন্ডার সমতা বলতে নারী পুরুষের চাহিদা, যোগ্যতা ও ক্ষমতা অনুযায়ী অধিকার ভোগ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমান ও অবারিত সুযোগ সুবিধাকে বোঝানো হয়। মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা বলতে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্য সমান সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তিকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ নারী পুরুষের একই ধরনের সামর্থ অনুযায়ী কাজের বা লেখাপড়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্ট অসুবিধাগুলো দূর করে সমতাপূর্ণ, সহযোগিতাপূর্ণ, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাকে জেন্ডার সমতা বলা হয়। জেন্ডার সমতার মাধ্যমে নারীকে নারীরূপে নয় বরং উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা প্রতিফলিত করা হয়। মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রেও জেন্ডার সমতার মাধ্যমে ছেলে মেয়ে হিসেবে নয় বরং তারা বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এজন্য মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ক্ষেত্রে একজন ছেলে শিক্ষার্থী যে সুযোগ সুবিধা পাবে একজন মেয়ে শিক্ষার্থীও তাই পাবে। শ্রেণী কার্যক্রমে একজন ছেলে শিক্ষার্থীর মত মেয়ে শিক্ষার্থীও সমান সুযোগ সুবিধা পাবে।
বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়নে সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়নে সরকার এবং বিভিন্ন NGO নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে করে জনগনের মধ্যে এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেন্ডার সচেতনতার বিষয়টি আগের চাইতে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে যেমন নারী অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা আছে, তেমনি বিভিন্ন আইন, অধ্যাদেশ ও বিধিমালায় নারী সম্পর্কীত বহুবিধ বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া সিডো (CEDAW)  সহ অনেক আন্তর্জতিক কনভেনশনেও নারী অধিকার, উন্নয়নে নারী, জেন্ডার ও উন্নয়ন সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতায় সরকারের ভূমিকা
বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনয়নে সরকারিভাবে নানা রকম প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নসহ নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। নিম্নে কিছু দিক বর্ণনা করা হলঃ
১.    জেন্ডার সচেতনতামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন।
২.    নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ২০০৩ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
৩.    এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ প্রণয়ন।
৪.    শিশু মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট আইন ২০০২ প্রণয়ন।
৫.    নারী বিষয়ক মন্ত্রনালয় প্রতিষ্ঠা ও পলিসি গ্রহণ।
৬.   মহিলা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নকার্য জোরদারকরণ।
৭.    জাতীয় মহিলা সংস্থা আইন ১৯৯১ প্রণয়ন।
৮.   পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ গঠন।
৯.    জাতীয় মহিলা নীতি ২০০৮ ঘোষণা।
১০.    যৌতুক, বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইন ১৯৮০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
১১.    প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মহিলা শিক্ষক নিয়োগে ৩০-৬০% কোটা প্রবর্তন।
১২.    গ্রামীন পর্যায়ে মহিলাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক অনুদান প্রদান।
১৩.    মহিলাদের কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ।
১৪.    শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে জেন্ডার বিষয়ক তথ্যাদি পাঠ্যসূচিতে অর্ন্তভূক্তকরণ।
১৫.    মুসলিম বিবাহ এবং তালাক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৯৭৪ গঠন।
১৬.    বাংলাদেশ গার্লস গাইড এসোসিয়েশন অ্যাক্ট ১৯৭৩ গঠন।
১৭.    মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ গঠন।
১৮.    বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ গঠন।
১৯.    এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন আইন ২০০৬ গঠন।
২০.    এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ গঠন ও বাস্তবায়ন।
২১.    দরিদ্রতার জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০০৭ গঠন।
২২.    নির্যাতিত, দুঃস্থ মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিল পরিচালনা নীতিমালা ২০০৪ গঠন।
২৩.    নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিভো) ১৯৭৯ এর প্রতি সমর্থন।
২৪.    সংবিধানে নারীর অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ।

সরকারের সঠিক পদক্ষেপে এনজিও সমূহের সহযোগিতায় মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য লাভ করেছে। জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষায় 2012 এবং 2013 সালে ছাত্রের চাইতে ছাত্রীরা অধিকহারে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগের লক্ষমাত্রা অর্জনের পথেও বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের সুষ্ঠ সমন্বয় এবং সামাজিক সচেতনতা দেশের উন্নয়নে এদেশের নারীসমাজকে প্রধান নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করতে পারে।

 

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প