ব্যবস্থাপনার ধারণা ও ব্যবস্থাপনার কার্যাবলী

একটি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে অবশ্যই ব্যবস্থাপনা ও এর কার্যাবলী সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও প্রয়োগিক ধারণা থাকতে হয়। অপরাপর প্রতিষ্ঠানের মতো বিদ্যালয়ও একটি প্রতিষ্ঠান। তাই ব্যবস্থাপনার মূলনীতিগুলো বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার সাথে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই ব্যবস্থাপনার নীতি পদ্ধতি ও এর প্রায়োগিক বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত ও সচেতন থাকতে হবে।

ব্যবস্থাপনা হলো দক্ষতার সাথে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট অপরাপর লোকের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন করিয়ে নেযার একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিযায় পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবস্থাপনা সচেষ্ট হয়। ব্যবস্থাপনার সয়লতা ও দক্ষতা প্রতিস্ঠানের সম্পদসমূহের সুষ্ঠ ব্যবহার সুনিশ্চিত করার উপর নির্ভরশীল। আর সম্পদসমূহের (মানব সম্পদ, আর্থিক সম্পদ, ভৌত সম্পদ, তথ্যগত সম্পদ)সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে অভীষ্ঠ্য লক্ষ্য হাসিলের জন্য ব্যবস্থাপককে এম অনুসারে একসেট কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।

ব্যবস্থাপনার কার্যাবলীর প্রকারভেদ সমূহ নিম্নরূপ

  1. পরিকল্পনা
  2. সংগঠন
  3. নির্দেশনা
  4. কর্মসংস্থান
  5. সমন্বয় সধন
  6. প্রেষণা সৃষ্টি
  7. নিয়ন্ত্রণ

ব্যবস্থাপনার মৌলিক কার্যাবলী
পরিকল্পনা(Planning) –
পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক এবং প্রাথমিক কাজ। ভবিষ্যত কার্যবলী সম্পাদনের জন্য অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে পরিকল্পনা বলে। যে কোন কার্য সম্পাদনের পূর্বে – সংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয়াদির পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। কোনদিন, কোথায়, কোনকার্য, কার দ্বারা, কিভাবে সম্পন্ন হবে তা স্থির করাই হচ্ছে পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যবলী নির্ধারণ এবং এদের বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল, নীতি, পলিসি, কর্মসূচী ইত্যাদি নির্ধারণই পরিকল্পনার অন্তর্ভূক্ত।

সাধারণত অতীত অভিজ্ঞতা, বর্তমান পারিপার্শিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শক্তি, সামর্থ্য, দুর্বলতা ইত্যাদি উপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনা প্রণীত হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ন্যায় পরিকল্পনা প্রণযনে বিভিন্ন বিকল্পসমূহ হতে সর্বোত্তমটি বেছে নেয়া হয়। মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির পরিকল্পনা প্রনয়ন সর্বোচ্চস্তরে হয়ে থাকে। এদের আলোকে মধ্যস্তর ও নিম্নস্তরে ব্যবস্থাপকগণ ও স্ব স্ব পরিকল্পনা প্রনয়ন করে থাকেন।

সংগঠন (Organising) -  লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগ্রহীত উপাদান ও মানবশক্তির সুশৃংখল বিন্যাসকে সংগঠন বলে। সংগঠন হচ্ছে একটি কাঠামো বিশেষ।সংগঠনের আওতায় কর্মিদের মধ্যে দায়িত্ব  ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে বন্টন করে দেয়া হয়। ফলে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য কর্মিরা সহজে অনুধাবন করে কার্য সম্পাদন করতে পারে। সংগঠন হলো অভীষ্ঠ্য লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি, জিনিশপত্র, যন্ত্রপাতি, সাজসরঞ্জাম ও কার্যক্ষেত্রে সুসংবদ্ধ সমাহার।

কর্মসংস্থান (Staffing) – সংগঠন কাঠামোতে মানবশক্তির অভাব পূরণের জন্য যে ব্যবস্থাপকীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তাকে কর্ম  সংস্থান বলে। এক্ষত্রে ব্যবস্থাপনা কার্য বিবরণ অনুযায়ী বিভিন্ন পদে কর্মি নিয়োগ, তাদের কাজের মূল্যায়ন, বেতন ও মজুরী নির্ধারণ ইত্যাদি কার্য সম্পাদন করে থাকে। প্রয়োজনীয় কর্মি নিয়োগ এব নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মিদের যতাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য ও অভিজ্ঞ করে তোলা না হলে ব্যবস্থাপকীয় কার্যাবলী পালনকরা সম্ভবপর হয় না। তাই এই  বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনার সাংগাঠনিক কাঠামো প্রনয়নের পর কর্মি সংস্থাপনের ব্যবস্থা করে থাকেন।

নির্দেশনা  (Direction) – পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংগঠন কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মিদেরকে যে আদেশ, উপদেশ বা পরামর্শ প্রদান করা হয়, তাকেই নির্দেশনা বলে। এটি এমন একটি সঞ্জিবনী শক্তি যার সাহায্যে ব্যবস্থাপক কি চান, তিনি কর্মিদের কাছ হতে কখন, কিভাবে, কি প্রত্যাশা করেন ইত্যাদি যথাযথভাবে তাদেরকে অবহিত করেন। কর্মিদের বোধগম্যতার জন্য সহজ ও সরল ভাষায় নির্দেশনার বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করতে হয়। কি করতে হবে- তা কর্মিদের অবহিত করা এবং তারা সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করাই নির্দেশনা

সমন্বয় সাধন (Coordination) – সমন্বয় দলগত সমঝোতার একটি মাধ্যম,প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত বিভিন্ন ব্যক্তি, দল ও বিভাগসমূহকে প্রতিষ্ঠানেরর মূল উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে তাদের স্ব স্ব কার্যাবলী সম্পাদন করতে হয়। যেহেতু সকলের মূল উদ্দেশ্যে এক ও অভিন্ন তা্ই তাদের কাজের মধ্যে সমন্বয় বা ঐক্য স্থাপন করা অপরিহার্য। অন্যথায় উদ্দেশ্যসমূহের বাস্তবায়ন ব্যহত হয়।  ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ ও বিভাগে নিয়োজিত কর্মিদের কাজের মধ্যে সংহতিও সামঞ্জস্য বিদান করে থাকে। 

প্রেষণা সৃষ্টি (Motivation) – প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মিদের মধ্যে কাজ করার উৎসাহ, উদ্দীপনা ও পরিতৃপ্তি বিধানের ব্যবস্থাপকীয় কার্যকে প্রেষণা বলা হয়। প্রেষণা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যা কাংখিত লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য কাজ সম্পাদনের প্রতি কর্মিদের আগ্রহ উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। প্রেষণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন ধরণের আর্থিক ও কল্যাণমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে। এদের মধ্যে উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান, চাকুরির নিরাপত্তা বিধান, আনুষঙ্গিক ভাতাদি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়ার সূযোগ, আমোদ প্রমোদরে ব্যবস্থা ইত্যাদি অন্যতম। প্রেষণার ফলে কর্মিদের কাজে আগ্রহ, অনুপ্রেরণা ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রতিষ্ঠানের কাজের মান ও দক্ষতা বৃদ্ধিসহ কর্মিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি গড়ে উঠে।

নিয়ন্ত্রণ (Controling) – ব্যবস্থাপনার মৌলিক কাজগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রন হচ্ছে সর্বশেষ ধাপ। পরিকল্পনা মাফিক প্রতিষ্ঠানের গুণগত ও পরিমানগত যাবতীয় কার্যাবলীর সম্পাদনের কাজকে নিয়ন্ত্রন বলা হয়। নিয়্ন্ত্রণ উদ্দেশ্য  অর্জনকে সুনিশ্চিত করে। নিয়ন্ত্রণ হলো গৃহীত পরিকল্পনা, জারিকৃত নির্দেশনা ও প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী কার্য পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তার পরীক্ষা করা।

বিদ্যালয় কোন বানিজ্যিক বা মুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সামজিক সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টি হয়। তাই সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার সাথে কেবল পেশাগত লোকজনই জড়িত নয়। একটি বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য প্রধানশিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক অভিবাবক কমিটি, স্বানীয় সরকার, শিক্ষা বিভাগসহ নানাধরণের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত থাকতে হয়। তাই বিদ্যালয়ের সফলতার জন্য এর সাথে সম্পর্কিত সকল অংশীজনের প্রত্যাশা ও আকাংখাকে ধারণ করে এর সাথে পেশাগত ধ্যান-ধারণার সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। তবেই ‍বিদ্যালয় তার অভীষ্ঠ্ লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।

 

 

সংগৃহীত ও সংকলিত

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প