বিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ বজায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সার্বিক ও সুষম বিকাশ সাধন। আর এর সিংহভাগ দায়িত্ব বর্তায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান প্রধান বা প্রধান শিক্ষকের উপর । প্রধান শিক্ষকের কর্মকুশলতা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও পরিবর্তনে বিশ্বাসী মন মানসিকতার উপর গোটা বিদ্যালয়, সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় উন্নতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রত্যেক প্রধান শিক্ষক চান তাঁর প্রতিষ্ঠানটি আলাদা স্বকীয়তায় পরিচিতি পাক। আর এজন্যই প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা বা Strategic Plan যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্ম আদায় করার কৌশল  অবলম্বন করা, যা কেবল চিন্তায় নয় বাস্তবে রূপ দেয়া।
পরিকল্পনা মানেই হচ্ছে, কোন কাজের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ, আর এ পরিকল্পনাকে কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিয়ে তাতে কৌশলগত প্রত্যয়ের উপর জোরারোপের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন। কোন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ধরণ, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দক্ষতা, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জসমূহ ও প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখে তা অর্জনের জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় সেটিই কৌশলগত পরিকল্পনা।  কৌশলগত পরিকল্পনায় বর্তমানের অবস্থানকে বিবেচনায় রেখে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত লক্ষ্য অর্জনের জন্য উদ্দেশ্যসমূহকে সুবিন্যস্ত করা হয় এবং এর উপর ভিত্তি করেই কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়।
Dream School  এর রূপায়নে কৌশলগত পরিকল্পনা (Strategic Planning) ধারণা, ধাপ, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগ

লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বল্প সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা, প্রতিষ্ঠানের সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, প্রধান সমস্যাসমূহ চিহ্নিতকরণ ও তা নিরসনের জন্য ধারাবাহিক কর্মসুচী বাস্তবায়ন এর জন্য Strategic Planning বা কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। Strategy শব্দটি গ্রীক “Stragos”  যার অর্থ সেনাবাহিনী এবং “Agos” অর্থ পরিচালনা। নিশ্চিত লক্ষ্য অর্জনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কাঠামো হচ্ছে কৌশলগত পরিকল্পনা। কৌশলগত পরিকল্পনায় মুলত প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণপূর্বক সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা অর্জনের জন্য উদ্দেশ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রনয়ন ও অগ্রগতি নিরুপনের জন্য নির্ধারকসমূহ প্রনয়ন করা হয়।

বিদ্যালয় একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক। দক্ষ ও নৈতিকতাসম্পন্ন দেশপ্রেমিক নতুন প্রজন্ম গড়ার মূল দায়িত্ব পালনে শিক্ষায়তনগুলোকে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার সফল বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পদ, সাংগঠনিক সূযোগ সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা ইত্যাদি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে বিদ্যালয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়ার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনার ব্যবহার যুগান্তকারী সাফল্যের সৃষ্টি করতে পারে।

কৌশলগত পরিকল্পনা মূলতঃ ইস্যু বা সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের পথ নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া। ষ্ট্রাটেজিক বা কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নে কতকগুলো পর্যায় বা ধাপ রয়েছে। একটি সুসংহত প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এই ধাপসমূহ অতিক্রম করে পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নযোগ্য করা হয়। কৌশলগত পরিকল্পনার ধাপসমূহ নিম্নরূপ


রূপকল্প (Vision) – একটি বিদ্যালয়ের রূপকল্প প্রণয়নে একটি বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্নের দরকার। এজন্য শিক্ষক, ছাত্র, অভিবাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রত্যাশা, স্বপ্ন আর আকাংখার শাব্দিক প্রতিফলন। বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে একটি Dream School এর স্বাপ্নিক কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। আর এই কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই রচিত হবে রূপকল্প বা Vision.
ব্রত (Mission) – একটি বিদ্যালয় তার আগামী দিনগুলোতে Stakeholder দের কোন কোন প্রত্যাশাগুলো পুরন করতে চায় বা বিদ্যালয় তার ভবিষ্যত লক্ষ্য পুরণে কোন কোন কাজসমূহ সম্পন্ন করতে চায় তা Mission Statement এ বিবৃত হয়।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Goals & Objectives) - Mission Statement এর সমন্বিত আকাংখার বাস্তবায়নে Component ভিত্তিক  লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ স্থির করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি শিক্ষার মান উন্নয়নের Mission কে সামনে রেখে তা অর্জনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ স্থিও করতে হয়, যাতে লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট ধাপসমূহ অতিক্রম করা সহজতর হয়।

পরিস্থিতির বিশ্লেষণ (Situation Analysis) – বিদ্যালয়ের কৌশলগত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়নের জন্য  Situation Analysis অতীব গুরুত্বপুর্ণ। এর জন্য SWOT analysis একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এতে S- Strength, W-weakness, O- OpportinityT-Threat বুঝানো হয়। এর মধ্যে Strength ও weakness প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ এবং Opportinity ও Threat প্রতিষ্ঠানের বাইরের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ একটি বিদ্যালয়ে Strength হিসেবে শিক্ষকদের সংখ্যা, বিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষমতা, পর্যাপ্ত ছাত্রসংখ্যা;weakness হিসেবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব, প্রেষনার অভাব, শিক্ষক-ছাত্র সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি বিবেচিত হতে পারে। পক্ষান্তরে Opportinity হিসেবে সরকারের অনুদান ও মনিটরিং, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা, Threat হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতে ছাত্রদের  অপব্যবহার, বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় আইন শৃংখলা জনিত পরিস্থিতির অবনতি, ইভ টিজিং ইত্যাদি  বিবেচিত হবে পারে।
কৌশল নির্ধারণ (Strategy Formulation) – একজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রধান আভ্যন্তরীণ সুবিধাসমূহ ব্যবহার করে বাইরের হুমকিসমূহ এবং বাইরের সুবিধাসমূহ ব্যবহার করে বিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাসমূহ দূর করার কৌশল নির্ধারণ করতে পারেন। পাশাপাশি কাংখিত লক্ষ্যসমূহের কোনটি অর্জনে কাদের সহায়তা নেবেন ও দায়িত্ব প্রদান করবেন সেটিও নির্ধারণ করতে হয়।  এর ফলে বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে বাঁধা বিপত্তির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাস্তবায়ন (Implementation) – বিদ্যালয়ের লক্ষ্য অর্জনে নির্ধারিত কৌশলসমূহ ব্যবহার করে সাফল্য অর্জনই কৌশলগত পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। আর এর জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে প্রণোদনা ও পূর্ণাঙ্গ মান অর্জনের মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।
মূল্যায়ন (Assessment) - কৌশলগত পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নির্ধারণের জন্য Performance Indicator নির্ধারণ। আর এই Indicator সমূহ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান নির্ধারণের পর ভবিষ্যত Target স্থির করা হয়। পাশাপাশি লক্ষ্যসমূহ আপাতঃ অর্জিত হবার পর পুণরায় Indicator সমূহ ব্যবহার করে নিশ্চিত করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় কোন ঘাটতি পরিলক্ষিত হলে, পুণরায় লক্ষ্য অর্জনের জন্য পুণঃ কৌশল নির্ধারণ করে সাফল্য  নিশ্চিত করা যায়।
এভাবে কৌশলগত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বিদ্যালয়কে ক্রমাগত উন্নতির পথে ধাবিত করে  Stakeholder দের স্বাপ্নিক Dream School এর রূপায়নের দিকে অগ্রসর করে নেয়া সম্ভবপর হয় ।

 

 

সংগৃহীত ও সংকলিত

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প