বাংলাদেশের নারী শিক্ষার বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের শিক্ষায় পুরুষদের তুলনায় নারীরা নানা দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের বা নারী শিক্ষার্থীদের অবস্থার তুলনামূলক উন্নতি ঘটলেও সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নারীরা এখনো অনেক পিছনে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে এবং উদ্যোগগুলোর ফলাফল ধীরগতিতে হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে নারী বা নারী শিক্ষার্থীরা যে জায়গাগুলোতে এগিয়ে রয়েছে তার একটি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়ে শিশুদের ভর্তির হার। সরকারি হিসাব থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায়ে বর্তমানে ভর্তির হার শতকরা ৯১ ভাগ যার মধ্যে মেয়ে শিশুরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে (যথাক্রমে ৯৪.৭ শতাংশ ও ৮৭.৮ শতাংশ) । গত কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল থেকেও দেখা যায়, সব শিক্ষাবোর্ডেই মেয়ে শিক্ষার্থীরা ছেলেদের তুলনায় ভালো কিংবা সমান ফলাফল করছে।

এই একই সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কখনো ভর্তি হয়নি এমন শিক্ষার্থীদের হিসাব থেকে দেখা যায়, সারাদেশে ১২ শতাংশেরও বেশি শিশু রয়েছে যারা কখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় নি এবং এক্ষেত্রে ছেলেদের হার মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি । সব মিলিয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীরা অন্তত বিদ্যালয় প্রবেশগম্যতার জায়গাটিতে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। চিত্র ১-এ বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়ে শিশুদের ভর্তির হারের বৃদ্ধির একটি তুলনামূল চিত্র পাওয়া যাবে। এতে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়ে শিশুর ভর্তির হার ছিল ৭৮.৫ শতাংশ, সেখানে ২০০৭ সালে এই হার বেড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌছেছে। প্রতি বছর ১.৮ শতাংশ হারে এই হার বাড়ছে। অবশ্য এটি সারা দেশের গড় অবস্থার চিত্র। এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে মেয়েদের ভর্তির হার ৫০ শতাংশ ও ছাড়ায় নি।

চিত্র ১: বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়ে শিশুর ভর্তির হার

সরকারি নানা উদ্যেগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওসমূহ তাদের শিক্ষাবিষয়ক কার্যাবলীতে মূলত দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুদের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করছে যেখানে মেয়ে শিশুরা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। উপানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত এসব বিদ্যালয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ মেয়ে শিশু ভর্তি করা হয়, যা অধিক সংখ্যক নারী শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষকদের দিক দিয়ে বিবেচনা করলেও দেখা যায়, শিক্ষার প্রতিটি স্তরে নারী শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের সরকারের ঘোষণা অনুসারে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় নারী ও পুরুষ শিক্ষকের অনুপাত হবে ৬০:৪০। এ সিদ্ধান্ত প্রতি বছর অধিক সংখ্যক নারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার মধ্যদিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই এ অনুপাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। প্রাকপ্রাথমিক স্তরের প্রায় শতভাগ শিক্ষকই নেয়া হচ্ছে নারী। এছাড়া চাকুরির অন্যান্য সেক্টরেও নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। শিক্ষায় অধিকসংখ্যক মেয়ে শিশুর অংশগ্রহণের বিষয়টি এখন প্রাথমিকের গণ্ডি ছড়িয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায়ও বিস্তৃত হয়েছে। ২০১২ ও ২০১৩ সালের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলে পরীক্ষার্থীর চাইতে লক্ষাধিক বেশী ছিল। জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ২০১৩ সালে পুরুষ পরীক্ষার্থীর চাইতে লক্ষাধিক বেশী মেয়ে পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। এই অগ্রগতির ধারাকে বেগবান ও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার, এনজিও এবং স্থানীয় সুশীল সমাজের ব্যপক করণীয় রয়েছে। দারিদ্র, পারিবারিক অনীহা, ধর্মী কুসংস্কার, ইভটিজিং, মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতার মতো বাঁধাসমূহ অতিক্রম করেই মেয়েরা এই সাফল্য অর্জন করেছে। তাই এই প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করা গেলে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবার মতো এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করবে।

 

সংগৃহীত ও সংকলিত

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প