নারী শিক্ষার ইতিবৃত্ত

উনিশ শতকের গোড়ার দিকেও এদেশের মেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ মোটেও পেত না। অভিজাত পরিবারে ও বৈঞ্চবীদের মধ্যে লেথাপড়ার নিজস্ব ধাঁচের ও সনাতনী ধারার চল ছিল। এই প্রেক্ষপটে ব্যাপকভাবে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য নবযুগের ব্যক্তিদের প্রচেষ্টার ফলে বাংলার নারী জগরণের সূচনা ঘটেছে।

তবে এ কথাও সত্য যে শ্রীরামপুরের মিশনারিরাই নারী শিক্ষার উদ্যোগ নেন সর্বপ্রথম, যদিও খ্রিস্টধর্মের প্রসারই ছিল মুল লক্ষ্য। ১৮১১ সালে প্রায় ৪০টি বালিকা নিয়ে উইলিয়াম কেরী-মার্শম্যান ও ওয়ার্ড ধর্মশিক্ষার জন্য প্রথম একটি বালিকা বিদ্যালয় খোলেন। ১৮১৮ সালে চুঁচুড়ায় বালিকাদের জন্য আলাদা একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন লন্ডন মিশনারি সোসাইটির রবার্ট মে । এরপর স্থানীয় ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের স্ত্রীদের উদ্যোগে অবিভক্ত বাংলায় প্রথম মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৯ সালের মে-জুন মাসে কলকাতায়। প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘দি ফিমের জুভেনাইল সোসাইটি’, এই প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য, জাতিধর্ম নির্বিশেষে ছাত্রীদের সুযোগ সৃষ্টি করে প্রথমে গেওরীবাড়িতে একটি, পরে আরো কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এসব স্কুলের ছাত্রীর সংখ্যা প্রথম বছর ছিল ৮ দ্বিতীয় বছর হয়েছিল ৩২।

মেরী অ্যান কুক যখন মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য উদ্যোগ নিচ্ছিলেন তখন বাংলার সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া নিষিদ্ধ ও দোষের বলে গণ্য করা হতো। মেয়েদের জন্মের পর থেকেই অবরুদ্ধ করে রাখা হতো, নানা ধর্মীয় ও সামাজিক বিধি-নিষিধে মেয়েদের মধ্যে ভয়ভীতি জাগিয়ে রাখা হতো। সে সময় পূর্ববঙ্গে মেয়েদের মধ্যে চালু ছিল যে ছড়াটি সেটি হলো :
‘লিখনং পঠনং মরণং দু:খে
মচ্ছ মারিব খাইব সুখে,
তবে কিঞ্চিৎ লিখনং বিবাহের কারণং।’

আট-দশ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যেত মেয়েদের। ওই বয়সের মধ্যে বিয়ের আগে বাপের বাড়িতে কেউ কেউ হয়তো বা অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হতো মাত্র।

তবে স্কুলে পড়ার বিষয়ে দেশীয়দের জাগরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে মেরী উইলসনের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে মহিলাদের কাছে আবেদন জানান, তাঁর আবেদনের ফলে বহু বাড়িতেই মা ও মেয়ে একসঙ্গে পড়তে শুরু করেন। অনেকেই স্কুলেও যেতে শুরু করেন।

১৮৬৩-৬৪ সালে ঢাকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুলে বা নর্মাল স্কুলের ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৬। অধিকাংশ ছাত্রী ছিলেন জাত বৈরাগিনী। উঁচু বংশের মহিলারা পড়তে আসতেন না। ভিড় করতেন খ্রিস্টান মহিলারা।

অভাবে এ দেশের মেয়েদের শিক্ষার প্রসার ঘটতে পারেনি। ১৮৬৭-৬৮ সালে পূর্বেবঙ্গের ছয়টি নর্মাল স্কুলে ছয়জন শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। তাদের বেতন ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারত সরকার মেরী কার্পেন্টারের পরামর্শ অনুযায়ী ফিমেল নরম্যাল ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠায় সম্মত হননি। উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৮৬-৮৭ সালে চারটি ট্রেনিং স্কুলে শিক্ষিকা প্রশিক্ষণের জন্য ২৪২ জন ছাত্রী পড়ত। ১৮৯৯-১৯০০ সালে তা বেড়ে ৭০১ জন হয়েছিল। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল কম। তা ছাড়া বাল্যবিবাহ ও অবরোধ প্রথার জন্য মেয়েরা শিক্ষা শেষ করতে পারত না। মেরী কার্পেন্টারের সকল কর্মোদ্যোগ এ দেশের মনীষীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন বীরাঙ্গনা। বিদেশের নারী সংগঠন থেকে তিনি ভারতের নারী শিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।

আরো একজন বিদুষী ইংরেজ মহিলা অ্যানেট অ্যাক্রয়েড(বিভারিজ) বাংলার নারীদের শিক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট আত্মনিয়োগ করে এ দেশের ইংরেজি শিক্ষিত উদ্যোগী ব্যক্তিদের সাহায্যে এগিয়ে যান এবং নিজেও স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭২ থেকে ১৮৯৩ পর্যন্ত তিনি বাংলার নারীদের শিক্ষার জন্য কাজ করেনে। বরিশাল,রংপুর, বগুড়া, ফরিদপুর, বীরভূম, বহরমপুর প্রভৃতি এলাকায় তিনি তাঁর স্বামী হেনরী বিভারিজের সঙ্গে ছিলেন এবং নারী শিক্ষার প্রসারে সহযোগিতা করেছেন।

নারী শিক্ষার প্রসারের ফলে উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের মধ্যে নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগ, ক্ষোভ, দাবি ও আবেদনপত্রের মাধ্যমে অনেক অবরোধবাসিনীর মনের কথা জানা গেল। তত দিনে সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে, শিক্ষিত সমাজে বহুবিবাহ ও কৌলিন্য প্রথা নিন্দিত, বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্তিমিতপ্রায় এবং নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে সমাজের মধ্যে বক্তব্য উঠলেও সকলের মধ্যেই নারী শিক্ষার জন্য আগ্রহ তীব্র হয়ে উঠেছিল। এমন এক সময়ে বাংলার নারীরা সচেতন হয়ে নিজেদের অধিকাররের কথা বলতে শুরু করল।

 

 

সংগৃহীত ও সংকলিত

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প