জীবন যুদ্ধে জয়ী সুমী ভূষিত হলেন জয়িতা পুরস্কারে

জীবন মানে যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধের হাতিয়ার হল আত্মবিশ্বাস। যদি লক্ষ্য থাকে অটুট তবে যুদ্ধ জয় হবেই। জীবনে শিক্ষা ও চাকুরির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে  তেমনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার ৫৯নং বন্দর মোল্লাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক সানজিদা জামান সুমী। সত্য নির্মম জেনে, কঠিন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে নানা প্রতিকুলতার মাঝেও অবিরাম যুদ্ধ করে চলেছেন তিনি। যে কারণে একজন যোদ্ধা-নারী হিসেবে বন্দর উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের বিবেচনায় জয়িতাদের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হয় তাঁর নাম। স্থানীয় উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে গত ৯ ডিসেম্বর’২০১৩ সকাল ১১টায় উপজেলা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে “জয়িতা” পুরস্কারে ভুষিত হন তিনি। সানজিদা জামান সুমী বরাবরই ছিলেন মেধাবী এবং পরিশ্রমী। ছোট্ট বেলা থেকেই অনেক বড় হওয়ার স্বপ্নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। আশা ছিল ডাক্তারী পড়বেন, অনেক বড় চিকিৎসক হবেন, একজন সেবক হিসেবে সারা দেশের মানুষের কাছে সুপরিচিতি হবে, ধনী-গরিব সকল শ্রেণীর রোগীকে সমপর্যায়ের সেবা দিয়ে সেবার সঠিক মান, আন্তরিকতা এবং নিরপেক্ষতারও স্বাক্ষর স্থাপন করবেন। এভাবেই স্থান-কাল-পাত্র ভেদে একজন সফল নারী হিসেবে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চান সুমী। এ ক্ষেত্রে ভাগ্য বিড়ম্বনায় ক্ষাণিকটা হোঁচট খেলেও বারবার নতুন পথের সন্ধানে নতুন পদক্ষেপে সুমীর পথচলা রয়েছে অব্যাহত। তাই আজ ডাক্তার না হলেও মানুষ গড়ার একজন সুদক্ষ কারিগর হিসেবে সর্বত্র ব্যাপক সুপরিচিতি তাঁর। নারীরা এখন অবলা নয়। যথাযথ শিক্ষা, কঠোর পরিশ্রম, সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে পথ চললে পুরুষের মত নারীরাও সফলতা আনতে পারে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছেন সানজিদা জামান সুমী। বর্তমানে বিএসএস ২য় বর্ষের ফাইনাল দিচ্ছেন সুমী। তাঁর লক্ষ্য  এমএসএস কমপ্লিট করে প্রাইমারী লেভেলের প্রধান শিক্ষক হবেন। সুযোগ পেলে পরবর্তীতে আরও বড় হওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।

শিক্ষা ও চাকুরির পাশাপাশি স্বামীর সংসারে তিনি একজন আদর্শ গৃহিণী। স্বামী ফজলুল হক, মেয়ে সাদিয়া (১১) এবং ছেলে ওমর সাঈদ সিনহা (৮) কে নিয়ে সুমীর পরিবার। স্বামীর প্রতি তাঁর অগাত বিশ্বাস ও অফুরন্ত ভালবাসা। স্বামীও তাঁকে অনেক ভালবাসেন। তাঁর ভাষ্যমতে স্বামীর ভালবাসা বিশ্বাস ও সহযোগিতা ছিল বলেই জীবনে এমন সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বামীর পাশাপাশি ভাসুরের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। কেননা বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে বাতির আলোতে লুকিয়ে লুকিয়ে সুমী যখন তার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তখন তাঁর ভাসুর বড় ভাইয়ের মত পাশে থেকে পুণরায় কলেজে ভর্তি ও পরবর্তী শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহ  যুগিয়েছিলেন।

বাহ্যিক সৌন্দর্য্য এবং শৈল্পিক গুণের কারণে আইএ পাশ করার আগেই একরকম তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বিয়ে হয় সুমী’র। এতে করে পারিবারিক সেশন-জটে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় তাঁর শিক্ষাস্বপ্ন। তবুও থেমে থাকেননি সুমী। পারিবারিক সকল জটিলতার উর্ধ্বে থেকে শিক্ষা এবং পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে গোপনে নিজের প্রচেষ্টায় প্রাইমারী শিক্ষকের এই সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ পান তিনি। আর এ কারণেই বেগম রোকেয়া দিবসে বন্দর উপজেলা পরিষদ তাঁকে এই জয়িতা পুরস্কারে ভুষিত করেন। সুমী জানান এই অর্জনে তাঁর হৃদয়ে লালিত দীর্ঘদিনের গোপন কষ্ট অনেকটা লাঘব করেছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ জয়ের ব্রত আমাকে একদিন লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে সে আত্মবিশ্বাস আমার আছে। যথাযথ শিক্ষা ও কর্ম সাফল্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এই আত্মপ্রত্যয়ে আমি সকলের দোয়া কামনা করছি।

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প