জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১

১৯৯৭ সালে ৮ মার্চ সরকার নারী উন্নয়ন নীতিমালা ঘোষণা করে। ২০০৪ সালে নারী নীতিমালা থেকে কিছু অংশ বাদ দিয়ে নারী নীতিমালা ২০০৪ সংশোধন করে ঘোষণা করে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় এসে ১৯৯৭ সালের ঘোষিত নীতিমালাকে কিছু সংস্কার করে আবার নতুন করে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১ ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে আমাদের সংবিধান ও জাতিসঙ্ঘ সনদকে সমন্বয় করে এটা প্রণীত হয়েছে। ২৮পৃষ্ঠায়  তিনটি ভাগে মোট ৪৯টি ধারা আছে এই নীতিমালায়। সম্পূর্ণ বাংলা শব্দে, স্পষ্টভাবে সহজ ভাষায় এটি লিখিত।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর যেসব অধিকার ও সুযোগ রয়েছে এবং জাতিসঙ্ঘ নারীসনদে যেসব ধারা রয়েছে তারই আলোকে সরকারের নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
আমাদের সংবিধানে নারীর অধিকার স্বীকৃত আছে। সেখানে পাওয়া যায়:
১. “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” (২৭ অনুচ্ছেদ)
২.“কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী বর্ণ নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।”) (২৮(১) অনুচ্ছেদ)
৩. “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী, পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। (২৮(২) অনুচ্ছেদ)
৪. “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্বাসের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের  অধীন করা  যাইবে না।” (২৮(৩) অনুচ্ছেদ)
৫. “নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের  যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের  কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।” (২৮(৪) অনুচ্ছেদ)
৬. “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে কোন নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে।” [২৯(১)]
৭. “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারীপুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মের নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।” [২৯(৩)]
সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদে ৪৫টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। ৯ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সমূহের উন্নয়নে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংবিধানে উল্লেখিত এইসব ধারার মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে  নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়ার কথা আছে। জাতীয় ‘নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ এই সংবিধান প্রদত্ত অধিকারকেই নিশ্চিত করেছে।
নারী নীতিমালার প্রধান লক্ষ্যসমূহ নিম্নরূপ :
১. ‘বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রীয় ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা’। (১৬.১)
২.‘ নারী-পুরুষের সমান বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা।’ (১৬.৮)
৩. ‘ স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন  ধর্মের কোন অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচলিত আইন  বিরোধী কোন বক্তব্য বা অনুরূপ কাজ বা কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করা’। (১৭.৫)
৪. ‘বৈষম্যমূলক কোন আইন প্রণয়ন না করা বা  বৈষম্যমূলক কোন সামাজিক প্রথার  উন্মেষ ঘটতে না দেয়া’। (১৭.৬)
৫. সম্পদ, কর্মস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া। (২৩.৫)
৬. ‘উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা।’ (২৫.২)
৭. নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও নীতির প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। (২৬.৬)

আমাদের সংবিধান, জাতিসঙ্ঘ সনদ, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি -২০১১ বাংলাদেশের নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। এগুলো যদি যথাযথ কার্যকর করা হয়, তাহলে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর হবে-মানব উন্নয়নেও আমরা সভ্যতার ইতিহাসে স্বাক্ষর রাখতে পারবো। এই দূর্জন, দূর্মুখ ব্যক্তিবর্গের কারণে আমরা যুগে যুগে অবদমিত থেকেছি। আমরা এবার সামনে এগোতে চাই নারীর ভাগ্য জয় করার লক্ষ্যে এবং নারী-পুরুষের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে আদর্শ বাঙালি সমাজ গঠন করতে। যেখানে ধর্ম-শিক্ষা-সংস্কৃতি-উন্নয়ন আমাদের জীবনযাপনে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারবে না। আমরা সবাই যেন মানুষ হই, মনুষত্ব ও বিবেকের আলোকে আমরা যেন পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে মানবিক অবদান রাখতে পারি। শুধু নারী নয়, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠুক উন্নততর জীবনাদর্শে।
 

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প