গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে এলিজা খানের বায়োগ্যাস প্লান্ট মডেল

মহিয়ষী নারী বেগম রোকেয়া দেশের নারী সমাজের নবজাগরণে নতুন এক রেনেসাঁর জন্ম দিয়ে গেছেন। নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার পরিশুদ্ধ জ্ঞান, কল্যাণকর কর্মকা- দ্বারা নারী সমাজ এগিয়ে যাওয়ায় দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র হয়েছে কল্যাণকামী। আমাদের যুগে নারী সমাজ তথা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেয়ায় প্রত্যন্ত পল্লীর মেধাবী, পরিশ্রমী, সুশিক্ষিত সফল এক নারীর নাম মিসেস এলিজা খান। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা গ্রামের এই নারী বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রাথমিক সমবায় সমিতি (মিল্কভিটা)’র চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণের সুযোগ্য সহধর্মিনী। এক সফল গো-খামারী, সুযোগ্য স্বামীর উৎসাহ-উদ্দীপনায় এলিজা খান নিজ বুদ্ধিমত্তায় একটি মডেল বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করে দেশের পল্লী অঞ্চলের নারী সমাজ ও গো-খামারীদের জন্য ইতিমধ্যেই বহুমুখী আয়ের উজ্জ্বল নজির স্থাপন ও গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে দ্রুত গতিতে কিভাবে সচল করা সম্ভব তা বাস্তবে রূপদান করেছেন। বুদ্ধিমত্তা আর নিয়মিত সঠিক তদারকীর ফলে তার মডেল ডেইরি ফার্মে গাভী থেকে দুগ্ধ উৎপন্নের পাশাপাশি প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ গোবর থেকে বায়োগ্যাস (মিথাইল গ্যাস) উৎপন্ন হচ্ছে। সেই বায়োগ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কৃষিপ্রধান এ দেশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার প্রস্তুত করে গ্রামীণ নারী সমাজকে উৎসাহিত করেছেন, কৃষিপ্রধান দেশের ফসলী জমির উর্বরাশক্তি রক্ষার পথ দেখিয়েছেন ও পল্লী উন্নয়নে রেখেছেন অবদান রাখছেন। এলিজা খানের এই কর্ম উদ্যোগ এখন জাতীয় লেভেলে নারী সমাজের জন্য অনুসরণীয় পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। অদম্য সাহস, আধুনিক কর্মকৌশল, সুদৃঢ় মনোবল ও সুযোগ্য স্বামীর উৎসাহ, সহযোগিতায় তিনি দেশের নারী সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন দ্রুতগতিতে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীও অবদান রাখতে পারে। দেশের গ্রামাঞ্চলের অবহেলিত নারী সমাজ গাভী পালনের মাধ্যমে বেশি বেশি অর্থ আয় করে  নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তারই চমৎকার দৃষ্টান্ত মডেল ডেইরি ফার্মের পাশে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মডেল একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন।

 

দুই.

বায়োগ্যাস প্লান্ট ও গোবর একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। গবাদিপশুর গোবর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস উৎপাদন, জ্বালানি এবং উৎকৃষ্টমানের জৈবসার প্রস্তুত করে সফল গো-খামারী এলিজা খান তার মডেল ডেইরি ফার্ম (গো-খামারের) ও বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে সফল নজির স্থাপন করেছেন। শাহজাদপুরের রাউতারা গ্রামে ‘মিসেস এলিজা খান মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট’ পরিদর্শন করে ‘গোবরে পদ্মফুল’র বাস্তব প্রমাণই পাওয়া গেলো। গাভী প্রতিপালন করে অর্থ উপার্জনে আউটপুট দুগ্ধ বা বাছুরের আর্থিক মূল্যের চেয়ে গোবরের আর্থিক মূল্য বহুগুণে বেশি। জানা গেছে, মিল্ক ইউনিয়ন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বগুড়া’র সহযোগিতায় তিনি গত ২০১২ সালে নিজ বাড়িতে এ প্লান্টটি গড়ে তোলেন। প্রথমে তিনি দেশ ও বিদেশ থেকে উন্নতজাতের বেশকিছু গবাদিপশু তার খামারের জন্য ক্রয় করে কয়েকজন রাখাল রেখে ওই গবাদিপশু আপন সন্তানের ন্যায় লালন-পালন শুরু করেন। একে একে উন্নত জাতের বাছুর ও উন্নত জাতের দুধেল গাভীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে গাভীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮টিতে। প্রতিটি উন্নত জাতের গাভী থেকে দু’বেলায় প্রায় ২৮০ লিটার দুধ সংগৃহিত হয়। ওই দুধ মিল্কভিটায় সরবরাহ করে দৈনিক প্রায় ১০ সহস্রাধিক টাকা আয় হচ্ছে। শুধু দুধ সংগ্রহ ও বাছুরের প্রজননের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি। তার পাশাপাশি তিনি বুদ্ধি ও মেধা মেধা খাটাতে থাকেন কিভাবে আরও বাড়তি আয় করা সম্ভব। তার চিন্তা-চেতনাকে বাস্তবতায় রূপদানের জন্য স্বামী, সফল গো-খামারী, বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড (মিল্কভিটা)’র চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণ ওই খামারকে বহুমুখী আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ‘বায়োগ্যাস প্লান্ট’ নির্মাণের পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ আর উৎসাহ পেয়ে এলিজা খান খামারের উত্তরপাশে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করে নাম দেন ‘মিসেস এলিজা খান মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট’। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একে একে তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে থাকে। একান্ত এক সাক্ষাৎকারে তিনি দৈনিক ইনকিলাব’কে জানান, ‘আগে গাভী লালন পালন করতাম দুধ উৎপদনের জন্য। কিন্তু একটি গো-খামার থেকে শুধু দুধ উৎপাদন করা হবে এখন আর এ ধারণার সাথে আমি একমত পোষণ করি না। দিন বদলের মতো মানুষের উন্নত, আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনায় একটি গো-খামারের আউটপুট হিসেবে দুগ্ধ উৎপাদন এখন আমার কাছে গৌণ বিষয়। মুখ্য বিষয় হচ্ছে, গবাদিপশুর মলমূত্র (গোবর) থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি উৎপাদন এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান এ দেশের জন্য, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস, ফসলী জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে জৈবসারের কোন বিকল্প নেই।’ দেশের একমাত্র ‘মিসেস এলিজা খান মডেল গো-খামার ও বায়োগ্যাস প্লান্ট’ স্থাপনের পর থেকে সেখানে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে উৎপন্ন হচ্ছে বায়োগ্যাস (মিথাইল গ্যাস)। ওই বায়োগ্যাসকে কাজে লাগিয়ে গ্যাসচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে ৫ হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদিত ওই ৫ হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে উৎপন্ন মিথাইল বায়োগ্যাসে চলছে পারিবারিক রান্নাবান্নার কাজ। বাড়তি বায়োগ্যাসের রিজার্ভার থেকে প্রতিসপ্তাহে একদিন একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকারের মাধ্যমে বায়োগ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। বায়োগ্যাসচালিত একটি ৫ কেভি জেনারেটর থেকে ৫ হাজার ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেই বিদ্যুৎ দিয়ে পুরো গো-খামারের যাবতীয় বৈদ্যুতিক প্রয়োজন মিটিয়েও বাড়তি হিসাবে মিসেস এলিজা খানের বসতবাড়িতে টেলিভিশন, ফ্রিজ, শক্তিশালী একটি বৈদ্যুতিক মোটর, বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালানোসহ তার আবাসিক খাতের পুরো বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, যারা একবার ওই খামার ও প্লান্ট পরিদর্শন করেছেন তারা এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

 

তিন.

বহির্বিশ্বের নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দুগ্ধ উৎপাদনকারী খ্যাতিমান দেশগুলোতে ডেইরি ফার্ম সংলগ্ন স্থানে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে সেসব দেশের গো-খামারীরা পরনির্ভরতা দূরীভূত করে স্বাবলম্বী হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন। বাংলাদেশের একমাত্র ওই মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট মাঝে মধ্যেই দেশ বিদেশের বিভিন্ন টিম এসে পরিদর্শন করে থাকেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে ফললুল হক ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আজহারুল হক, ড. মোহাম্মদ মনির হোসেন, বিএলআরআইএর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আব্দুল জলিলসহ মিল্কভিটার কর্মকর্তাবৃন্দ এই মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্ট পরিদর্শন করে অভিভূত হন এবং সারাদেশের গো-খামারীদের মাঝে এই পদ্ধতি ছড়িয়ে দেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান আর দেশের গো-খামারীদের সচেতন করে তোলা। দেশের গো-খামারীদের মডেল গো-খামারী এলিজা খানের সফল বায়োগ্যাস প্লান্টের আদলে দেশের প্রতিটি খামারের পাশে একটি করে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে সব রকমের পৃষ্ঠপোষকতা সরকারকে করতে হবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তাহলে দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি গো-খামার সেক্টরে এক বিপ্লব ঘটে যাবে।

 

চার.

অতীতে যখন রাসায়নিক সার ছিল না তখন দেশের কৃষকেরা জৈব সার ফসলী জমিতে প্রয়োগ করতেন। ফলে জমিতে উৎপাদিত ফসলের গুণগত পুষ্টিমানও বজায় থাকতো। আর এ কারণে অতীতে দেশের মানুষ বর্তমানের তুলনায় কম মাত্রায় রোগাক্রান্ত হতেন। বর্তমানে অল্প ফসলী জমিতে অধিক ফসল ফলনের আশায় জমিতে নানা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নিয়মানুসারে প্রয়োগ না করে অতিমাত্রায় প্রয়োগ করায় জমির উর্বরাশক্তি হ্রাস ও উৎপাদিত ফসলের পুষ্টিমান কমেছে বহুগুণে। নানা ধরনের রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার ও যথাযথ পদ্ধতিতে প্রয়োগ না করায় দেশের শষ্যভা-ার খ্যাত উত্তরাঞ্চলসহ দেশের সর্বত্র ফসলী জমিতে প্রয়োগকৃত রাসায়নিক সার অনেক সময়ই কোন কাজে আসছে না। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ফসলী জমিতে জৈব সার প্রয়োগ করা হলে জমিতে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। কিন্তু জৈব সার প্রয়োগ না করায় ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে রাসায়নিক সার অতিমাত্রায় প্রয়োগ করায় ফসলী জমিতে অ্যাসিডিটি বৃদ্ধি ও উর্বরাশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফসলী জমির উর্বরাশক্তি, পরিবেশের ভারসাম্যতা হ্রাস ও কৃষি প্রধান দেশের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘিœত হবে, যা ভবিষ্যতে তীব্র খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টির একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। জানা গেছে, উন্নত বিশ্বের ফসলী জমিতে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন জৈব সারের অধিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদগণ। আমাদের দেশের ফসলী জমিতে বিভিন্ন ধরনের সুষম রাসায়নিক সার অতি মাত্রায় ব্যবহারে জমির পিএইচ-এর মাত্রা নিউট্রালে না থেকে স্থানভেদে কম বা বেশি হচ্ছে যা ফসলী জমির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলে দেশের ফসলী জমিতে উর্বরাশক্তি অতীতের তুলনায় ক্রমবর্ধমান হারে হ্রাস পাচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল ফসল ফলনের আশায় অজ্ঞ কৃষকরা ফসলী জমিতে মাত্রাতিরিক্ত হারে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করায় বিভিন্ন ধরনের ফসলের উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও জমিতে রোপিত ফসল মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ নিতে পারছে না। ফলে কৃষক আশানুরূপ ফসল ফলাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ইরি-বোরো ধান চাষের সময় এক বিঘা জমিতে দুই দফায় ৩০-৩৬ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগের নিয়ম থাকলেও কৃষক অধিক ফলনের আশায় ৫০ থেকে ৬০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করছে। ফলে সরকারি হিসাবে ইউরিয়া সারের চাহিদার পরিমাণ যোগানের তুলনায় বেশি লাগছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে ইউরিয়া সারের উৎপাদন খরচ পড়ে ১৭৫০ টাকা। আমদানিকৃত ইউরিয়া সারের খরচও প্রায় ১৭৫০ থেকে ১৮০০ টাকা পড়ে যায়। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার তা বিক্রি করছে বস্তাপ্রতি প্রায় ১ হাজার টাকায়। প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারে সরকার প্রায় ৭৫০ টাকা অর্থ ভর্তুকি দিয়ে কৃষকের মধ্যে সার বিক্রি করছে। কিন্তু সরকার কর্তৃক ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের কাছে বিক্রয়কৃত সার যথাযথ পদ্ধতিতে প্রয়োগ না করায় জমিতে ব্যবহৃত সারের অপচয় দিন দিন বাড়ছে। সরকার ও কৃষক উভয়েই আর্থিক দিক দিয়ে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের নিউজিল্যান্ড খ্যাত জনপদ শুধুমাত্র শাহজাদপুর উপজেলাই রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক গো-সম্পদ (সরকারি শুমারি অনুসারে, বাস্তবে এ সম্পদের সংখ্যা আরও বেশি)। ওই বিশাল গো-সম্পদ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ কেজি গোবর পাওয়া যাচ্ছে যার মাসিক মূল্যমান প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে সারাদেশে প্রতিদিনের গোবর প্রাপ্তির সঠিক পরিসংখ্যান এখনও পর্যন্ত পাওয়া না গেলেও একটি উপজেলাই যদি দিনে প্রায় ৪০ লাখ কেজি গোবর পাওয়া যায় তাহলে সারাদেশে কি পরিমাণ গোবর পাওয়া যাচ্ছে তা একটু খতিয়ে দেখলেই বোধগম্য হবে। ওই গোবর ৪ থেকে ৫ মাস মাটির নিচে পুঁতে রেখে পুরোপুরি পচিয়ে উন্নত মানের জৈব সার হিসেবে ফসলী জমিতে ব্যবহৃত না হয়ে জ্বালানি হিসেবে (স্থানীয় ভাষায় ঘষি) ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘গোবর’ নামীয় অতি সহজলভ্য, পরিবেশবান্ধব ও জমির উর্বরাশক্তি, ফসলের উৎপাদন ও পুষ্টিগুণমান বৃদ্ধিকারী ওই জৈব সার হিসেবে ফসলী জমিতে সঠিক ব্যবহার করা হলে একদিকে যেমন কৃষকের ফসলের উৎপাদন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকার পাশাপাশি জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পাবে ও ফসল উৎপাদন বেড়ে যাবে। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলের পুষ্টিগ্রহণের ক্ষমতাও বেড়ে যাবে ও রোগবালাই অনেক কমে যাবে বলে অভিজ্ঞ কৃষিবিদদের অভিমত। বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদগণ কৃষকদের রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে জৈব সার হিসেবে ফসলী জমিতে গোবর প্রয়োগের পরামর্শ দিলেও এখনো অনেক কৃষকের সচেতনতার অভাব ও যথাযথ জ্ঞান না থাকায় ফসলী জমিতে জৈব সার হিসেবে গোবর প্রয়োগে কোন উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগে খরচ বৃদ্ধি ও পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি জমির উর্বরাশক্তি হ্রাস, মাটি থেকে ফসলের পুষ্টিগ্রহণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অপরদিকে মিসেস এলিজা খান মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্টের মতো দেশের প্রতিটি গো-খামারে এরূপ একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে গোবর থেকে উৎপন্ন জৈব সার ফসলী জমিতে প্রয়োগ করা হলে সব দিক বিবেচনায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটবে এবং কৃষক ও দেশ উপকৃত হবে।

ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন, প্রাচীন অজ্ঞতার বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে দেশ সামনের দিকে ডিজিটালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ডিজিটাল দেশের জন্য আর এনালগ চিন্তা করলে চলবে না। ডিজিটাল দেশের জন্য ডিজিটাল চিন্তাই করতে হবে। সে হিসাবে দেশের প্রতিটি গো-খামারের পাশে সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় মিসেস এলিজা খান মডেল ডেইরি ফার্ম ও বায়োগ্যাস প্লান্টের মতো একটি করে বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরির উদ্যোগ নেয়া অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। এতে করে প্রতিটি গো-খামারী দুগ্ধ উৎপাদনের পাশাপাশি বায়োগ্যাস উৎপাদন করে গ্যাসচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেদের জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারবেন। পাশাপাশি উৎপন্ন বাড়তি বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস এবং পরিবেশবান্ধব জৈবসার সরবরাহ ও বিক্রি করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই গো-খামারীরা আর্থিকভাবে উপকৃত হতে পারবেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে ডিজিটাল দেশ গড়ায় ও কৃষিপ্রধান দেশে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে ও খরচ কমাতে সহায়তা করবে। এতে কৃষিপ্রধান এ দেশের কৃষক ও দেশবাসী উপকৃত হবেন। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে আরও দ্রুত গতিতে ঘুরাতে এবং দেশের গ্রামীণ জনপদে নারী সমাজের ব্যাপক উন্নয়নে মিসেস এলিজা খানের সফল কর্মকা-কে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে এই আদলে দেশের প্রতিটি গো-খামারে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ও মিল্ক ইউনিয়নের মাধ্যমে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কার্যকর পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। তাহলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, গ্রামাঞ্চলের জনসাধারণ আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন এবং কৃষিপ্রধান দেশ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প