মোমবাতি তৈরি ব্যবসা

দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে মোমবাতি অন্যতম। অল্প খরচের মধ্যে আলো পেতে মোমবাতি খুবই উপকারি পণ্য। কাঁচামাল হিসেবে প্যারাফিন ব্যবহার করে খুব সহজে মোমবাতি তৈরি করা যায়। বর্তমান সময়ে প্রয়োজনীয় সময়ে আলো দানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, এমনকি শো পিস হিসেবেও নানা রঙ ও আকৃতির মোমবাতি ব্যবহার করা হচ্ছে।  একজন বেকার নারী বা পুরুষ নিজের কর্মসংস্থানের জন্য মোমবাতি তৈরির ব্যবসা শুরু করতে পারেন।

বাজার সম্ভাবনা
গ্রাম বা শহর সব জায়গার মানুষ মোমবাতির ব্যবহার করে। মোমবাতি তৈরি করে নিজ এলাকা বা এলাকার বাইরে মুদি দোকান গুলোতে পাইকারী দরে বিক্রি করা যেতে পারে। সাধারণত বিভিন্ন আকৃতির নকশা করা নানা রঙের মোমবাতির চাহিদা মূলত: শহরেই বেশি দেখা যায়। এ জাতীয় মোমবাতি শহরের সৌখিন পণ্য বিক্রির দোকানে সরবরাহ করা যেতে পারে।
 

স্বল্প সুদে ঋণ:

আনুমানিক ৭৫০০-৮০০০ টাকার স্থায়ী উপকরণ এবং ৮০০-১০০০ টাকার কাঁচামাল কিনে মোমবাতি তৈরির ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন নিজের কাছে না থাকলে স্থানীয় ঋণদানকারী ব্যাংক (সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক)বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান (আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক, প্রশিকা) থেকে শর্ত সাপেক্ষে স্বল্প সুদে ঋণ নেয়া যেতে পারে।

প্রশিক্ষণ
প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য মোমবাতি তৈরীতে অভিজ্ঞ এমন কোন ব্যক্তি, স্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক), যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

দরকারি জিনিসপত্র

স্হায়ী কাঁচামাল এগুলো কোথায় পাওয়া যাবে কাচামালের আনুমানিক দাম (টাকায়)

  • ডাইস * মোমবাতি তরির কারখানায় * ৭,৫০০.০০
  • কড়াই * থালা-বাটির দোকানে ১২০.০০
  • পাত্র * থালা-বাটির দোকানে ৬০.০০
  • ছুরি * থালা-বাটির দোকানে ২৫.০০
  • কাঁচি * থালা-বাটির দোকানে ৫০.০০
  • চামচ * থালা-বাটির দোকানে ৬০.০০
  • মগ * থালা-বাটির দোকানে ১০.০০
  • বালতি * থালা-বাটির দোকানে ৬০.০০
  • তুলি * রঙের দোকানে ২০.০০
  • স্টোভ * থালা-বাটির দোকানে ১০০.০০
  • মোট = ৮,০০৫.০০

প্রথম ধাপ

মোম তৈরির ডাইস বা ছাঁচের দুটি অংশ একটি ছিঁটকিনি দিয়ে আটাকানো থাকে। এবং ডাইসের ভিতরে মোমবাতি আকৃতির কতগুলো খাঁজ থাকে। প্রথমে ডাইসের ছিটকিনি খুলে ছাঁচের দুইটি অংশ আলাদা করতে হবে। এরপর একটি কাপড়ে তেল নিয়ে ডাইসের ভিতরে থাকা খাঁজগুলো ভালো ভাবে মুছে নিতে হবে, যাতে করে  মোমগুলো খুব সহজে বের করা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ
ছাঁচের মধ্যে সলতে পরানোর জায়গা রয়েছে। সলতেগুলো উপর থেকে নিচ পর্যন্ত টান টান করে বেঁধে দিতে হবে।

তৃতীয় ধাপ
এরপর ছাঁচের ২টি অংশ এক সাথে আটঁকে দিতে হবে এবং ছাঁচের সাথে লাগানো পানির ট্যাংকে পানি ভরতে হবে। কারণ পানি ভরা থাকলে গরম মোম ঠান্ডা হতে সহজ হয়।

চতুর্থ ধাপ
এবার চুলায় কড়াই বসাতে হবে। কড়াই গরম হলে তার মধ্যে সাদা শক্ত মোম (প্যারাফিন) দিতে  হবে। মোম পুরোপুরি গলে যাবার আগেই কড়াইতে ১০ ভাগ মোমের সাথে ১ ভাগ স্টিয়ারিক এসিড মিশাতে হবে।

পঞ্চম ধাপ
প্যারাফিন গলে যাবার পর বেশিক্ষণ চুলায় রাখা যাবে না। কারণ গলে যাওয়া প্যারাফিন বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে পারে।

ষষ্ঠ ধাপ
গলা মোম মগে বা চামচে করে আস্তে আস্তে মেশিনের খাঁজগুলোতে ঢালতে হবে।

সপ্তম ধাপ
মোম ঢালার খাঁজটি যতক্ষণ না পুরোপুরিভাবে ভরবে ততক্ষণ পর্যন্ত মোম ঢালতে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, মোম ঢালার সময় খাঁজের ভেতরে যেন কোন ফাঁকা থেকে না যায়।

অষ্টম ধাপ
২০২৫ মিনিট পর মোমগুলো ঠান্ডা হলে ছাঁচের ২টি অংশ আলাদা করে মোমগুলো বের করে আনতে হবে

নবম ধাপ
এবার মোমের সলতের বাড়তি অংশগুলো সাইজ মত কাটতে হবে এবং মোমবাতি ভালোভাবে বসানোর জন্য নিচের অংশের তলাটি সমান করে কাটতে হবে। বিভিন্ন আকৃতির নকশা করা মোম তৈরির জন্য সেই অনুযায়ী ছাঁচ তৈরি করতে হয়।

সাবধানতা

  • মোমবাতি তৈরি করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সর্তক থাকতে হবে-
  • স্টিয়ারিক এসিড মোমের সাথে মেশানোর সময় সাবধান থাকতে হবে।
  • মোমে যদি আগুন ধরে যায় তবে সঙ্গে সঙ্গে চুলা নিভিয়ে ঢাকনা দিয়ে কড়াই ঢেকে দিতে হবে।
  • চুলার উপর কড়াই থাকা অবস্থায় রং মেশানো যাবে না, চুলা থেকে নামিয়ে রং মেশাতে হবে।
  • মোম তৈরির কাচামাল থেকে ও তৈরির সময় শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে।
  • কাজ শেষে মোমের ছাঁচটি পরিস্কার করে রাখলে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

কাঁচামালের খরচ

  • কাঁচামাল পরিমাণ দাম (টাকায়)
  • সাদমোম ১০০০০ গ্রাম ৫০০.০০
  • ইস্টারিক এসিড ১০০০ গ্রাম ৫৫.০০
  • সুতা ২৫০ গ্রাম ১৮.০০
  • রং ৫০০ গ্রাম ৭.০০
  • সয়াবিন ৫০ গ্রাম ২.০০
  • প্যাকেট ২৫ টি ২৫.০০
  • লেবেল ২৫ টি ২.৫০
  • আঠা আনুমানিক ৫.০০
  • মোট = ৬১৪.৫০

সবসময়ের জন্য দরকারি জিনিসপত্রের খরচ

  • জিনিসপত্র পরিমাণ দাম (টাকায়)
  • ডাইস ১ টা ৭৫০০.০০
  • কড়াই ২ টা ১২০.০০
  • পাত্র ২ টা ৬০.০০
  • ছুরি ১ টা ২৫.০০
  • কাচি ১ টা ৫০.০০
  • চামচ ৩ টা ১টা বড়, ২টা ছোট) ৬০.০০
  • মগ ১ টা ১০.০০
  • বালতি ১ টা ৬০.০০
  • কৌটা ৪ টা (ছোট) ২০.০০
  • স্টোভ ১ টা ১০০.০০
  • মোট = ৮,০০৫.০০

অন্যান্য খরচ

  • খরচের খাত টাকার পরিমাণ
  • যাতায়াত (কাঁচামাল ও জিনিসপত্র কেনা ও মোমবাতি বেচার জন্য) ১০০
  • জ্বালানি (কেরোসিন)-১ কেজি ২০
  • মজুরি-১ দিন ৬০
  • মোট =১৮০

৩টি খাতের মোট খরচ

খরচের খাত টাকার পরিমাণ

  • কাঁচামাল ৬১৪.৫০
  • স্হায়ী খরচ (মোট খরচের ০.০৫%) ৪.০০
  • অন্যান্য খরচ ১৮০.০০
  • মোট =৭৯৮.৫০

উপরের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে   ৯৮.৫০ টাকা খরচ করে ৫.০০ টাকা দামের ২৫০টি মোম উৎপাদন করা যাবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি মোম ৪০০ টাকা দরে দোকানে বেচা যাবে। এই দরে বেচলে ২৫০টি মোমের মোট দাম পাওয়া যাবে ১০০০ টাকা। এই হিসাব থেকে সহজেই প্রকৃত লাভ বের করা যায়। যেমন-

২৫০ টি মোম দোকানে বেচে পাওয়া যাবে ১০০০.০০ টাকা

২৫০ টি মোম তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৭৯৮.৫০ টাকা

প্রকৃত লাভ =২০১.৫০ টাকা

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ১দিনে ২৫০টি মোমবাতি তৈরি করে বেচার পর ২০১৫০ টাকা লাভ করা যেতে পারে। এখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বাজার দরের ভিত্তিতে আয়-ব্যযের হিসাব বের করা হলো। কিন্তু কাঁচামাল ও জিনিসপত্রের দাম প্রায়ই ওঠানামা করে তাই এই হিসাবটি কম বা বেশি হতে পারে।

সুতরাং বলা যায় যে, অন্যান্য অকৃষি উদ্যোগের মতই মোমবাতি তৈরি এখনও বেঁচে থাকার একটি ভালো উপায় হিসেবে অনেক দরিদ্র মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য। তাই আজকের বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য এমনকি পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সংস্হান করার একটি উতকৃষ্ট উপায় হতে পারে মোমবাতি তৈরি করে বিক্রি করা।

কেস স্টাডি:

মোমে আলোকিত ফারজানা
অভাবের তাড়নায় অনেকটা বাধ্য হয়েই ফারজানা একদিন শুরু করেছিল মোমবাতি তৈরির কাজ। রাত-দিন কাজ করেছে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের আশায়। তার পরের গল্পটা অন্যরকম। মোমবাতি তৈরি করেই সংসারের অভাব দূর করেছে ফারজানা। মোমের আলোর মতোই এখন সুখের আলো ছড়িয়ে পড়ছে মিরপুর পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্পের ফারজানার ঘরে। ফারজানা এখন মোমের আলোয় আলোকিত। ফারজানা জানায়, ‘মায়ের মায়া ভরা মুখ খুব একটা মনে পড়ে না। তবে মা’র আদর এখনও অনুভব করি। আমার পাঁচ বছর বয়সে একদিন হঠাৎ করেই মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু মন এখনও পেতে চায় মায়ের আঁচলের তলায় নিরাপদ আশ্রয়। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎ মা ঘরে আসার পর শুরু হয় অশান্তি।’ স্কুল কী ফারজানা জানে না। অনাদর আর অবহেলায় দিন কেটে যায়। যে বয়সে খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে অভাব আর পারিবারিক প্রয়োজনে সম্পৃক্ত হয়েছিল কাজের বাঁধনে। ৭ বছর বয়স খেকেই ফারজানা একটি গুল তৈরির কারখানায় গুলের কৌটায় লেবেল লাগানোর কাজ শুরু করে। কাজ করে যে টাকা পেত, তা সব সৎ মা’র হাতে এনে দিতে হতো। দিনে দিনে সুন্দর কোমলমতি শিশু ফারজানা বেড়ে ওঠে, সুন্দর তরুণী হিসেবে নজর কাড়ে এলাকার সবার। ১২ বছর বয়সেই প্রতিবেশী আবুল কালাম পছন্দ করে বিয়ে করে তাকে। তার পর শুরু হয় আরেক দুঃখের গল্প। টিএমএসএস সূত্রে জানা যায়, মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রতিবেশী কালামের সঙ্গে ফারজানার বিয়ে হয়। ছোটবেলা থেকে অভাব আর গঞ্জনার মাঝে বেড়ে ওঠা ফারজানা বিয়ের পর ভেবে ছিল, অভাব আর অশান্তির দুনিয়া থেকে রেহাই পেল। কিন্তু না, কালাম ছিল কর্মবিমুখ, আড্ডাবাজ যুবক। যার ফলে সংসারে দেখা দেয় অভাব। অভাবের তাড়নায় এক সময় বাধ্য হয়ে ফারজানার স্বামী কালাম একটি মোমবাতি তৈরি কারখানায় কাজ নেয়। মাঝে-মধ্যে বাড়তি কাজ বাড়িতে নিয়ে আসে। বুদ্ধিমতি ফারজানা স্বামীর মোমবাতি তৈরি করা খুব মনোযোগ সহকারে দেখত। দেখে দেখেই একদিন ফারজানা মোমবাতি বানানো শিখে যায়। কাজ শিখে ফারজানা নিজেই একটা কিছু করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। ফারজানা জানে, অন্যের কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তেমন একটা লাভ হয় না।এদিকে ফারজানা-কালামের সংসারে নতুন অতিথির আগমন ঘটে। ফারজানার কোলজুড়ে আসে এক মেয়ে সন্তান। সন্তানের আগমনও তার জন্য বাড়তি খরচ হয়ে দেখা দেয়। এ অবস্থায় কী করা যায়, এই ভেবে দু’জনেই দিশেহারা। ভাবনার এক পর্যায়ে এক প্রতিবেশী খবর দেয় এলাকার একটি সমিতির, যার নাম ‘মিল্লাত ক্যাম্প শ্রমজীবী মহিলা শক্তি’ সমিতির অফিসের নাম টিএমএসএস। প্রতিবেশী জানায়, সমিতির অফিস গ্রুপ তৈরি করে নারীদের ঋণ দেয়, উন্নয়নমূলক আলোচনা করে। পরবর্তী সময়ে সমিতির কর্মকান্ডের খোঁজ-খবর  নিয়ে ফারজানা আর দেরি না করে সমিতির সদস্য হয়ে যায়। ২৯ আগস্ট, ২০০৬ সালে সে সমিতির সদস্য হয়। সেই সময় সমিতির সদস্য ছিল মাত্র ৬ জন। এ অবস্থাতেই ফারজানা টিএমএসএস থেকে ঋণ নিয়ে মোমবাতি তৈরির কাজ শুরু করে। তারপর মিল্লাত ক্যাম্প, ১১/বি, পল্লবী, মিরপুর ১ এই ঠিকানায় ফারজানা গড়ে তোলে নিজের আবাস। শুরু হয় ফারজানার স্বপ্ন দেখা। অভাবের সংসার মোমবাতির আলোয় আলোকিত হতে শুরু করে। এবার কারখানার কাজের পাশাপাশি নিজেরাও মোমবাতি তৈরি করা শুরু করে। নিজেরাই মোম তৈরি করে পাইকারিভাবে বিক্রি করতে থাকে। প্রথম ঋণ নিয়েই কাজ শুরু করেছিল, আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের। দ্বিতীয়বার ঋণ নিয়ে তৈরি করে ঘরের সঙ্গে লাগানো একটি মুদি দোকান।

ফারজানার কোলজুড়ে আসতে থাকে একের পর এক নতুন অতিথি। এখন স্বামী আর চার মেয়ে নিয়ে তার সংসার। সন্তানের সংখ্যা বেশি হলেও তৃপ্তির হাসি আছে ফারজানার ঠোঁটের কোণে। কারণ তার মেয়েগুলো বুদ্ধিমতি ও কর্মঠ। স্কুলেও পড়ছে, আবার অন্যের বুটিকস কারচুপির কারখানায় কাজও করে। ফারজানার স্বপ্ন, চার মেয়েকেই তার সামর্থ্য মতো লেখাপড়া শেখাবে। ১৮ বছরের আগে বিয়ে দেয়ার কথা চিন্তাই করবে না। কারণ অল্প বয়সে বিয়ে হলে মা এবং সন্তান দুই জনেরই সমস্যা হয়। সে নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে শিখেছে। ফারজানা আজ আর্থিকভাবে সচ্ছল।

সমিতি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৭ হাজার টাকা মাসিক কিস্তি উঠিয়েছে ফারজানা। কোনো খেলাপি হয়নি। সঞ্চয় জমা আছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। ডিপিএস আছে ২০০ টাকা করে। ফারজানা জানায়, সচেতনতা আর বুদ্ধি তেমনভাবে কাজ না করার ফলে ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই চার সন্তানের মা হয়েছি। এখনকার মতো জ্ঞান থাকলে ২ টার বেশি সন্তান নিতাম না। ফারজানা গর্বিত, স্বামী এখন তাকে আর আগের মতো অবহেলা করে না। মোমবাতি তৈরি বা মুদি দোকানের কাজ তারা দু’জনে এক সঙ্গেই করে।  ফারজানা জানায়, বিয়ের পর তাদের সংসাবে অভাব ছাড়া আর কিছুই ছিল না। টিএমএসএসের ঋণ নিয়েই ব্যবসা বড় করেছে। একটি মাত্র ঘর ছিল, আজ দুটি ঘর হয়েছে, হয়েছে পানির ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা। ফারজানার মতে, নারীদের কাজ স্বীকৃতি দেয়া দরকার, কারণ পুরুষ বা নারী সবাই সমান। নির্যাতন সম্পর্কে সে বলে, ‘আমাদের মহল্লায় নারীদের নির্যাতিত হতে দেখলে সেখানে ছুটে যাই, বোঝাতে চেষ্টা করি, স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই মিলেমিশে জীবনটাকে চালাতে হবে’। সেখানে তাদের সঙ্গে কথা বলি, এটা ঠিক কাজ নয়। নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।  একদিন অভাবের তাড়নায় ফারজানার যে চোখে অন্ধকার বাসা বেঁধে ছিল, মোমবাতি তৈরি করে ফারজানার সেই চোখে-মুখে আজ আলোর দীপ্তশিখা জ্বল জ্বল করছে

মোমের আলোয় আলোকিত ফাতেমার জীবন
মোমবাতি তৈরি করে অভাবের সংসারে সুখের আলো জ্বালিয়েছেন আমতলী সদর উপজেলার হলদিয়া গ্রামের ফাতেমা বেগম। ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মোমবাতি তৈরি শুরু করে কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৫ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। কিনেছেন জায়গা-জমি, তৈরি করেছেন ঘরবাড়ি। করেছেন ব্যবসার প্রসার। মোমাবাতি তৈরির পাশাপাশি আগরবাতি ও চানাচুরও তৈরি করছেন। ফাতেমার কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ জন মহিলার। ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কথা কলে জানা যায়, তারা পাঁচ ভাই ও এক বোন। ৮ বছর বয়সে বাবা মারা যান। মায়ের ওপর সংসার পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার পরিচালনা করতেন। স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও প্রথম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। অসহায় মায়ের সংসারে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন। মা মেয়ের চিন্তায় দুর্বল হয়ে যায়। ১৮ বছর বয়সে হলদিয়া গ্রামের মোকলেচ খলিফার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি শ্বশুরবাড়ি যান। সেখানের অবস্থাও আরও করুণ। সেখানেও শ্বশুর ছিল না। শাশুড়ি, ভাসুর ও দেবরের মধ্যে স্বামী ছিল দ্বিতীয়। শ্বশুরবাড়িও অভাবের সংসার। রাতে ঘরের ভেতর থেকে চাঁদের আলো চোখে পড়ত। এ অভাবের মধ্যে শাশুড়ি ছেলেদের আলাদা করে দেয়। স্বামীর শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকায় কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ মেলেনি। তাই কোনো উপায় না পেয়ে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চিটাগাং বড় শহরে কাজের সন্ধানে যান। সেখানে কোনো পরিচিত লোক ছিল না। স্বামী রাজ জোগালি করত। নিজে ইট ভেঙে সংসার চালাত। পলিথিন দিয়ে বাসা বানিয়ে থাকতেন। এভাবে ১৬টি বছর থাকার পরেও কোনো উন্নতি হয়নি। তাই আবার নিজ এলাকা হলদিয়া ফিরে আসেন।
বাড়ি ফেরার পর দেখেন ঘরটি উলিতে খেয়ে ফেলেছে। থাকার কোনো জায়গা নেই। তাই আবার অন্যের ঘরে চারটি বছর কেটেছে। এর মধ্যে স্বামী কামলা দিয়ে সংসার চালায়। মেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে দিতে হবে। তাই ভাবল এভাবে জীবন কাটানো যায় না। নিজের কিছু করা দরকার। মোম তৈরির ফ্যাক্টরিতে ১ বছর কাজ করলেন। তার পরে মনে উদয় হলো এভাবে অন্যের ফ্যাক্টরিতে কাজ করে উন্নতি করা যাবে না। নিজে একটি ছোট মোম বাতি তৈরি করার মেশিন ক্রয় করবেন। মনে ইচ্ছা হলেই তো হলো না, কারণ স্বামী এ প্রস্তাবে রাজি হলো না।
আহ্ছানিয়া মিশন আমতলীর শাখা ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন জানান, এ অবস্থায় স্বামীর অজান্তে ফাতেমা বেগম বাড়ির পাশে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের দলীয় সভায় উপস্থিত হয়ে নিয়ম-কানুন জেনে নেয়। সমিতিতে গেলে মহিলারা তাকে বাঁকা চোখে দেখেন। ফাতেমা বেগমকে দলে নেয়া যাবে না, কারণ তিনি টাকার অভাবে ১৬টি বছর চিটাগাং ছিল। আবার টাকা পেলে চিটাগাং চলে যাবে। কারণ চিটাগাং একবার তিনি চিনে আসছেন।
দলের সভানেত্রী পারুল বেগম তাকে সোনার তরী দলে সদস্য করার দায়িত্ব নেন। সদস্য হওয়ার পর নিয়মত সঞ্চয় করার কিছুদিন পর ১০ হাজার টাকা মোমবাতি তৈরির জন্য ঋণ গ্রহণ করেন। তিনি ওই টাকা দিয়ে মোম তৈরির একটি মেশিন ক্রয় করেন। প্রথমে ৫ টাকা ও ১০ টাকা দামের মোম তৈরি করে ছোট ছোট বাজারে ক্ষুদ্র ও বড় দোকানে পাইকারি দেন। মোমের ব্যাপক চাহিদা তিনি দেখতে পান। উৎপাদিত মোমের সঙ্গে আগর বাতি তৈরি করার সিদ্ধান্ত করেন, সঙ্গে সঙ্গে বানাতে শুরু করে। ওই কারখানায় প্রথমে দুই-একজন মহিলা কর্মসংস্থানে সুযোগ পায় ও নিজেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয়বার ১৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে ব্যবসার টাকা দিয়ে সর্বমোট ৩০ হাজার টাকায় চানাচুর তৈরির ডাইস ক্রয় করেন। চানাচুর ও ঝালমুড়ি তৈরি ও প্যাকেটিং করে বাজারে পাইকারি দেন। তৃতীয়বার ২০ হাজার টাকার লোন করে এ টাকা দিয়ে চানাচুর, মটর ডাল, ঝালমুড়ি, মোমবাতি ও আগরবাতি তৈরি করে বাজারজাতকরণের সুবিধা গ্রহণ করেন। এ প্রকল্পে প্যাকেটিং করার জন্য ১০-১৫ জন মহিলার কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেন। তার ছেলে ওই উৎপাদিত মালামাল বিভিন্ন বাজারে আমতলী, চুনাখালী, কলাপাড়া, তালুকদারহাট, মহিষকাটা, গাজীপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা পাইকারি দেন।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের আর্থিক সহায়তায় মোড় ঘুরিয়ে দেন। বর্তমানে তার প্রকল্পে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূলধন রয়েছে। এ ছাড়াও দুটি গরু, যার মূল্য ৪০ হাজার টাকা এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে টিনের একটি ঘর তৈরি করেছেন। বর্তমানে তার চোখেমুখে সচ্ছলতার হাসি। এক সময় যে অভাবী নারী সমাজের কাছে তুচ্ছ ছিল, তার মোমের আলোয় সমাজকে করে আলোকিত। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের আর্থিক সহায়তা দারিদ্র্যকে জয় করে সমাজের সফল নারী হিসেবে পরিচয় দিতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফাতেমা বেগম।

 

 

 

 

 

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প