পানের দোকান

ছোটখাটো নানান ধরনের ব্যবসার মাধ্যমে মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারেন। পান-সুপারি বিক্রির ব্যবসা এ ধরনের ব্যবসার মধ্যে অন্যতম। খুব সামান্য পুঁজি দিয়েই এ ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। পাইকারি দরে পান, সুপারি, জর্দা কিনে পানের খিলি বানিয়ে বিক্রি করাকে পেশা হিসেবে নিয়ে যে কোনো ব্যক্তি উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পারেন। আমাদের দেশে বয়স্ক লোকের কাছে পানের বেশ চাহিদা রয়েছে। রাস্তার পাশে, হাট বা বাজারে, রাস্তার মোড়ে পানের দোকান দেয়া যেতে পারে।
অল্প পুঁজি নিয়ে যেসব ব্যবসা শুরু করা যায় তার মধ্যে পানের দোকান অন্যতম। পরিবারের বয়স্ক বা শারিরীক ভাবে অক্ষম ব্যক্তিরাও পানের দোকান করে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

বাজার সম্ভাবনা
আমাদের দেশে বয়স্ক লোকের কাছে পানের বেশ চাহিদা রয়েছে। রাস্তার পাশে, হাট বা বাজারে, রাস্তার মোড়ে পানের দোকান দেয়া যেতে পারে। পাইকারি দরে পান, সুপারি, জর্দা কিনে পানের খিলি বানিয়ে বিক্রি করাকে পেশা হিসেবে নিয়ে যে কোন ব্যক্তি উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পারেন।

মূলধন  
আনুমানিক ২৫০০-৩০০০ টাকা মূলধন নিয়ে পানের দোকান ব্যবসা করা সম্ভব। বড় আকারে পানের দোকান শুরু করতে চাইলে যদি নিজের কাছে প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকে তাহলে স্থানীয় ঋণদানকারী ব্যাংক, সরকারী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) থেকে শর্ত সাপেক্ষে স্বল্প সুদে ঋণ নেয়া যেতে পারে।

প্রশিক্ষণ
পানের ব্যবসা শুরু করার জন্য তেমন কোন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে ধারণা নিয়ে পানের ব্যবসা শুরু করা সম্ভব।

প্রয়োজনীয় উপকরণ, পরিমাণ, মূল্য ও প্রাপ্তিস্থান

স্থায়ী উপকরণ  

উপকরণ

পরিমাণ

আনুমানিক মূল্য (টাকা)

প্রাপ্তিস্থান

পান রাখার ট্রে

১টি

২৮০-৩০০

তৈজসপত্রের দোকান

বালতি

১টি

৪৫-৫০

তৈজসপত্রের দোকান

কৌটা

১টি

৩৫-৪০

তৈজসপত্রের দোকান

                                      মোট=৩৬০-৩৯০ টাকা

 

কাঁচামাল 

উপকরণ

পরিমাণ

আনুমানিক মূল্য (টাকা)

প্রাপ্তিস্থান

পান

১০০টি

৫৫-৬৮

পাইকারি দোকান

সুপারি

১ কেজি

১০০-১০৫

পাইকারি দোকান

চুন

১ কেজি

৩০-৩৫

পাইকারি দোকান

জর্দা

১ কেজি

৬০০-৬১০

পাইকারি দোকান

মোট=৭৯৫-৮১৮ টাকা

দোকান পরিচালনার কিছু বিষয়
পানের দোকান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলা উচিত। যেমন :  
সুন্দর ব্যবহার  
ক্রেতার সাথে ভালো ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভালো ব্যবহার পেলে দোকানে ক্রেতা বেশী হয়।
ন্যায্য লাভ
অনেক দোকানী বেশি লাভের আশায় অধিক দাম রাখে। এক্ষেত্রে এমন একটা দাম নির্ধারণ করলে ভালো হয় যেন ক্রেতা বিক্রেতা কারো ক্ষতি না হয়।
পরিস্কার-পরিছন্নতা  
পানের দোকান পরিস্কার পরিছন্ন রাখা অতি জরুরী। খেয়াল রাখতে হবে, দোকানের আশপাশ যেন স্যাঁতসেঁতে না হয়।
 

আনুমানিক আয় ও লাভের পরিমাণ

খরচ

স্থায়ী যন্ত্রপাতির অবচয় (ক্ষতি) বাবদ

৩-৪ টাকা

কাঁচামাল বাবদ

৭৯৫-৮১৮ টাকা

মোট=৭৯৮-৮২২ টাকা

আয় ও লাভ
প্রতিটি পানের খিলি বিক্রি হয় ২ টাকা হারে। এক ব্যক্তি প্রতিদিন আয় করে ২০০-২২০ টাকা। তার প্রতিদিনের খরচ ১০০-১১০ টাকা। অর্থাৎ লাভ ১০০-১১০ টাকা। তবে সময় ও স্থানভেদে এর কম বা বেশি লাভ হতে পারে।

স্থায়ী উপকরণগুলো একবার কিনলে অনেকদিন ধরে কাজ করা যাবে। ব্যবসার শুরুতেই এ খরচটি করতে পারলে পরবর্তীতে শুধু কাঁচামাল কিনে ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। যে কোন ব্যক্তি অল্প পুঁজিতে এ ব্যবসা করে লাভবান হতে পারেন। ছোট আকারে অল্প  পুঁজি বিনিয়োগ করেই পানের দোকানের ব্যবসা শুরু করা সম্ভব।

কেস স্টাডি:
পানের দোকান দিয়ে স্বাবলম্বী

যশোর সদর উপজেলার হাসিমপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লাইলী। দরিদ্র পরিবারে জন্মের পরও কষ্ট করে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। সুখের আশায় দরিদ্র বাবা লাইলী বেগমকে যশোর সদর উপজেলার একই গ্রামের লোকমান মুন্সির সঙ্গে বিয়ে দেন। দুই বছরের মাথায় তাদের কোলজুড়ে আসে একটি ছেলেসন্তান। সুখ আর লাইলীর কপালে সয় না। বিয়ের ১২ বছর পর তার স্বামী মারা যায়। সন্তান নিয়ে লাইলী বেগমের তখন আর বাবার বাড়িতে জায়গা হয় না। ফলে পাশের গ্রাম বেলতলায় মামার বাড়ি চলে আসে। মামার সংসারেও অভাব। কাজ না করে অন্ন জুটবে সে উপায় নেই। দু’মুঠো অন্ন খেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে কোলের শিশুকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে  ঝিয়ের কাজ করে। সেই কাজেও নানা গঞ্জনা শুনতে হয়। নিজে লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার প্রবল ইচ্ছা লাইলীর। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব। এই জন্য প্রয়োজন অর্থের। মহিলা হওয়ার জন্য মাঠেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করা সম্ভব হয় না। অন্যের বাসায় কাজ করে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে শুধু দুবেলা অন্নের জোগান হয়। আর কোনো কিছুই হয় না। তাই মনে মনে ভাবল ভিক্ষা করবে। এতে করে খেয়ে-পরে কিছু সঞ্চয় করা যাবে।

এক সময় কথা হয় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের মাঠকর্মী সীমা রানীর সঙ্গে। হতদরিদ্র লাইলী বেগমের জীবনের দঃখের কথা শুনে সীমা রানী ভর্তি করে নেয় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের চাঁদনী মহিলা সমিতিতে। লাইলী সমিতির মিটিং ও আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে থাকে। বাড়তে থাকে তার জ্ঞানের পরিধি। সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনে জানতে পারে নিজেদের স্বনির্ভরতার কথা। এর ফলে তার ভেতরে জাগ্রত হতে থাকে আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন। শুধু স্বপ্ন দেখলেই জীবন চলে না। স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে লাগে শ্রম আর অর্থ। কঠিন পরিশ্রম করার সামর্থ্য তার আছে। যদি কিছু পুঁজির ব্যবস্থা করা যেত তাহলে রাস্তার মোড়ে পান-সুপারি আর বিস্কুট বিক্রি করে নিজে স্বাবলম্বী হতে পারত। কিন্তু টাকা পাবে কোথায়। সে জানে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তার গ্রামের অনেকেই মিশন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন কাজ করছে। মিশন সমাজের দরিদ্র, অবহেলিত ও নিঃস্ব পরিবারের মহিলাদের নানা আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে ঋণ দিয়ে থাকে। আলাপ আলোচনা করে লাইলী বেগম মিশনের চাঁদনী সমিতি থেকে ৬ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। ঋণকৃত টাকা দিয়ে রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা দোকান দিয়ে পান-সুপারি, বিস্কুট, চানাচুর বিক্রি শুরু করেন। প্রতিদিন যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে থাকেন, মোটামুটি কোনোভাবে চলে যায়। নতুন দোকান তাই বিক্রি বেশি না হওয়ায় লাইলী বেগম চিন্তায় পড়ে যান ঋণের টাকা পরিশোধের ব্যাপারে। সে তাই স্থান পরিবর্তন করে খাজুরা বাসস্ট্যান্ড মোড়ে দোকান নিয়ে যান। এতে বিক্রির পরিমাণও বেড়ে যায়। এখন আর তার অভাব নেই।

লাইলী বেগমকে আর অন্যের বাসায় কাজ করতে হয় না। লাইলী বেগমের স্বপ্ন এ কাজের মাধ্যমে তার ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে একটি ভালো কাজে দেবে। নিজে এক টুকরো জমি কিনে ঘর বানাবে, যেন আর মামার বাড়ি থাকতে না হয়। দিন দিন তার কাজের অভিজ্ঞতা বাড়ছে। দোকানে আস্তে আস্তে বিক্রি বেশি  হচ্ছে, ছেলে স্কুল থেকে এসে তার বিক্রিতে সাহায্য করে, আয়ও বাড়ছে। প্রতি দিন সংসার ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে ও জমাতে পারছে টাকা। এবার ঋণ পরিশোধ হলে আরও ১০ হাজার টাকা ঋণ নেবে। ঋণ নিয়ে দোকানটি বড় করে ক্রেতাদের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল তুলবে। সে স্বপ্নও তার পূরণ হবে বলে আশা করেন লাইলী। তার সংসারে অভাব নেই, চোখে-মুখে নেই হতাশার কোনো চিহ্ন। জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। আরও ভালোভাবে বাঁচার জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। কীভাবে অভাবকে জয় করতে হয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লাইলী  বেগম।

 

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প