মাছের ঘেরের পাড়ে সবজি ও ফল চাষ

ভূমিকাঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে সমুদ্রের উপকূলের জেলা গুলিতে কৃষি জমিতে ঘের করে চিংড়ি ও সাদা/রুই জাতীয় মাছের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু লবনাক্ত পানির ঘের ও কিছু মিঠা পানির ঘের। বিভিন্ন প্রতিকুলতা ও অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য কৃষি জমি মৎস্য চাষে পরিবর্তিত হচ্ছে। লবণাক্ত এলাকা বৃদ্ধি, ভবদহ ও বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ফসল উৎপাদন না হওয়ায় ঐ জমিগুলি মৎস্য চাষের আওতায় এসেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, পিরোজপুর জেলা গুলিতে ব্যাপক মৎস্য ঘের তৈরী হয়েছে। এই মৎস্য ঘেরের একটি বড় অংশ পাঁড় তৈরীতে চলে যায়। এই পাঁড় গুলির অধিকাংশই পতিত অথবা মৌসুম ভিত্তিক কিছু সবজির চাষ হয়। এই মৎস্য ঘেরের পাঁড় গুলি অধিক উর্বর, জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ, সবজি উৎপাদনের অনুকূল। সম্ভবনাময় মৎস্য ঘেরের পাঁড় গুলিকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে লাগসই কার্যক্রম গ্রহণ করলে দেশের সবজি ও ফলের চাহিদা পূরণসহ বিদেশে মানসম্মত সবজি রপ্তানী করা সম্ভব।
মৎস্য ঘেরের পাড়ের বর্তমান অবস্থাঃ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের এই ঘের গুলির অধিকাংশে বাগদা চিংড়ির সাথে সাথে পারশ্বে, ভেটকি চাষ হয় এবং অন্য ঘের গুলিতে গলদা চিংড়ির সাথে রুই জাতীয় মাছের চাষ হয়। অধিকাংশ ঘেরের পাড়গুলি পতিত অবস্থায় থাকে। কিছু কিছু ঘেরের পাঁড়ে মৌসুম ভিত্তিক সবজির চাষ হয়। বিশেষ করে বাগেরহাট জেলার রামপাল, মোল্যাহাট, ফকিরহাট খুলনা জেলার ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা যশোর জেলার অভয়নগর মনিরামপুর উপজেলায় মৎস্য ঘেরের পাঁড়ে ব্যাপক সবজি চাষ হয়ে থাকে। অধিকাংশ ঘেরের পাঁড়ে লাউ, করলা, পেপে, কলা, ঢেরশ, টমোটোর চাষ হয়। এই সমস্ত ঘেরের পাঁড়ের সবজির ফলন মাঠের সবজির ফলনের চেয়ে অনেক বেশী।
সম্ভাবনাময় মৎস্য ঘেরের পাঁড়ের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য সুপারিশ
  • মৎস্য ঘেরের পাঁড়ের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য গবেষণা করা।
  • ঘেরের পাঁড়ে উৎপাদন উপযোগী জাত উদ্ভাবন।
  • নিবিড় সবজি চাষ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করে প্রযুক্তি প্রদান।
  • লবণাক্ততা সহনশীল সবজি ও ফলের জাত উদ্ভাবন।
  • ঘেরের মালিকদের সবজি উৎপাদনের প্রশিক্ষণে ব্যবস্থা করা।
  • পাঁড়গুলি পতিত না রেখে সবজি উৎপাদনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা।

ঘেরের পাঁড়ে ফসল চাষের জন্য করণীয়

  • সব মৌসুমে হয় এমন লতানো সবজি নির্বাচন যেমন-লাউ, করলা, চাল কুমড়া, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক ইত্যাদি।

  • সব মৌসুমে হয় এমন সবজি যেমন-ঢেরশ, কাঁচকলা, পেপে, মরিচ।
  • কারিগরি সহযোগিতার জন্য কৃষি সম্প্রসাণের সংগে যোগাযোগ করা।
  • উন্নতমানের বীজ ও চারা সংগ্রহ।
  • পাঁড়ের উপরে, মাঁচায় ও পানি সংলগ্ন স্থানে চাষের জন্য পরিকল্পনা তৈরী।
ঘেরের পাঁড়ে রোপণযোগ্য সবজি ও ফল
  • পাঁড় হতে পুকুরের মধ্যে মাঁচায় চাষযোগ্য সবজি যথা-লাউ, চাল কুমড়া, করলা, চিচিংগা, ঝিংগা, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক।
  • পাঁড়ের সবজি-ঢেড়শ, টমোটো, ডাটা, লাল শাক, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা, কলা, পেপে, কচু, বেগুন।
  • মসলা-মরিচ, আদা, পিয়াঁজ, রসুন, ধনিয়া।
  • ফল-পেয়ারা, কুল, লেবু, আম্রপালি আম, সরিফা।
ফলন চাষের জন্য পাঁড় প্রস্তুত লতানো সবজির জন্য মাদা তৈরী
  • লাউ, কুমড়া, চাল কুমড়া, করলার জন্য ৭৫ সেমি চওড়া ও ৭৫ সেমি গভীর করে গর্ত তৈরী করতে হবে। গর্তে ১০-১৫ কেজি গোবর/কম্পোষ্ট, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ১৫০ গ্রাম এমওপি, ১০০ গ্রাম জীপসাম ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে পানি দিয়ে গর্ত ভরে রাখতে হবে। একদিন পর ২০ গ্রাম দস্তা মাটির সথে মিশিয়ে ২০-২৫ দিন রেখে আবার কুপিয়ে মাটির সংগে মিশাতে হবে। এর ৫-৬ দিন পর মাদায় বীজ অথবা চারা রোপন করা যাবে।
  • টমেটো, বাঁধা কপি, ফুলকপি, মরিচ, ঢেড়শ-এর জন্য পাঁড় কুপিয়ে শতাংশে ৭৫০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমপি ৪৫০ গ্রাম, জীপসাম দিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হবে। চারা রোপনের পর তিন কিস্তিতে শতাংশে ০১ কেজি ইউরিয়া উপরি অংশে প্রয়োগ করতে হবে।
  • কলা ও পেপের জন্য লাউ, কুমড়ার মতো মাদা করে চারা রোপন করে ফল ধরার আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে ১০০ গ্রাম হারে ইউরিয়া ও এমওপি দিলে ফসল ভাল হয়।
চারা/বীজ বপন/রোপনের সময়
ফসল
রোপন/বপন সময়
লাউ
করলা/উচ্ছে
কুমড়া/চাল কুমড়া
সীম
বরবটি
শ্রাবন-ভাদ্র
আর্শ্বিন, মাঘ-চৈত্র
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ
শ্রাবন-ভাদ্র
শ্রাবন ভাদ্র/চৈত্র-আষাঢ়
 
পরিচর্যা
  • লাউ, কুমড়া, করলা প্রভৃতি লতানো সবজি একটু লম্বা হলে মাঁচা তৈরী করে মাঁচায় উঠিয়ে দিতে হবে। পুকুরের ভিতর মাঁচা করলে পাঁড়ের জমি নষ্ট হয় না। পাঁড়ে অন্য সবজি করা যায়।
  • চারা রোপনের পর নিয়মিত সেচ প্রদান করতে হবে।
  • আগাছা হলে আগাছা পরিস্কার করতে হবে।
  • পোকা মাকড় দেখা দিলে বন্ধু পোকা ও শত্রু পোকা সনাক্ত করে আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে পোকা ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
ঘেরের পাঁড়ে সবজি চাষে সুবিধা
  • পতিত জমির ব্যবহার বৃদ্ধি।
  • বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হয়।
  • কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
  • পুষ্টি চাহদা পূরণ
  • কম খরচে উন্নতমানের সবজি পাওয়া যায়।
  • ঘেরের মধ্যে মাঁচায় সবজি করায় বাড়তি জায়গা লাগেনা।
  • সমস্ত ঘেরের পাঁড়ে সবজি করলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরে রপ্তানী করা সম্ভব।
  • বিষ মুক্ত সবজি পাওয়া যায়।
ঘেরের পাঁড়ে সবজি চাষের অসুবিধা
  • বেশী কুপিয়ে সবজি চাষ করলে পাঁড় ভেঙ্গে যেতে পারে।
  • বড় গাছ লাগালে পাতা পড়ে পুকুরের পানি নষ্ট হতে পারে।
  • যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকলে সবজির ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায়না।
  • মৎস্য ঘেরে খাবার দিতে সমস্যা হয়।
  • লবণাক্ত পানিতে সবজি মারা যাবে।
 
 
তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প