ফলের বাগান স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের গ্রীষ্ম ও অবগ্রীষ্ম মণ্ডলীয় আবহাওয়া  ফল ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল জন্মে থাকে। স্থানীয় ও বিদেশি ফল এ দেশের উষ্ণ-অব উষ্ণ জলবায়ুতে জন্মে বিধায় স্বাদে, গন্ধে, আকারে ও ফলনে নানা বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশে বহু রকম ফল উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও মাথাপিছু দৈনিক ফলের প্রাপ্যতা ৭৭ গ্রাম যা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত ন্যূনতম চাহিদা মাত্রার চেয়ে কম (১১৫ গ্রাম)। সুপারিশকৃত ন্যূনতম চাহিদা মাত্রা অনুযায়ী ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে বছরে ৬৭.১৬ লাখ টন ফল প্রয়োজন। বর্তমানে ২.৪৩ লাখ হেক্টর জমিতে বাগান আকারে এবং বাগানবহির্ভূত এলাকায় (বসতবাড়ি, পুকুর পাড়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চত্বর, রাস্তার ধার প্রভৃতি) ৪৫.২১ লাখ টন ফল উৎপাদিত হয় (বিবিএস, ২০১১) যা প্রয়োজনের তুলানায় অনেক কম। উপরন্তু মৌসুমভিত্তিক প্রাপ্যতা, উচ্চ সংগ্রহোত্তর অপচয় ও ক্রয়ক্ষমতাজনিত পার্থক্য এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে রেখেছে। ফলের দৈনন্দিন প্রাপ্যতা বাড়াতে হলে এর উৎপাদন বাড়াতে হবে, সংগ্রহোত্তর অপচয় কমাতে হবে ও সারা বছর দেশীয় ফলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অধিকাংশ ফল দেখতে আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু এবং সব শ্রেণীর লোকের কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। ফলে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান কম বেশি রয়েছে। খাদ্যপ্রাণ, খনিজ পদার্থ এবং সহজে আত্তীকরণযোগ্য শর্করা অধিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকায় এগুলো মানুষের পুষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম। ফল রান্না বা কোন প্রকার প্রক্রিয়াজাত না করে সরাসরি খাওয়া হয় বিধায় এতে বিদ্যমান সবটুকু পুষ্টি উপাদানই গ্রহণ করা সম্ভব। বেশ কিছু পুষ্টি উপাদান বিশেষ করে ভিটামিন সি, রান্না বা প্রক্রিয়াজাত করার দরুণ নষ্ট হয়ে যায়। ফল ব্যতীত এ ধরনের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ অসম্ভব। এজন্য নিয়মিত ও প্রচুর পরিমাণে ফল খেলে পুষ্টি সমস্যা দেখা দেয় না। তাই মাঠ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সুষম খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টিও সমধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। ফল ফসলের সমস্যা, সম্ভাবনা এবং গাছের বৈশিষ্ট্য মাঠ ফসল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এজন্য ফল ফসলের চাষ তথা ফলের নতুন বাগান স্থাপনে মাঠ ফসল থেকে ভিন্ন ধরনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ফল উৎপাদনে বহুবিধ সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে

 

চাষোপযোগী  জমির স্বল্পতা

  • অপ্রতুল উন্নত জাত ও অনিয়মিত ফল ধারণ
  • মৌসুমভিত্তিক প্রাপ্যতা
  • অপর্যাপ্ত গুণগতমানসম্পন্ন রোপণ দ্রব্য
  • পরিচর্যার অভাব ও রোগ ও পোকা-মাকড়ের উচ্চ প্রাদুর্ভাব
  • উচ্চ সংগ্রহোত্তর অপচয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  • ফল চুরি হওয়া
  • ফল চাষে কৃষকদের সচেতনতার অভাব
  • প্রযুক্তি হস্তান্তরে ধীরগতি ও বাজারজাতকরণে প্রতিবন্ধকতা

 

ফল ফসলের নতুন বাগান স্থাপন

ফল বাগান তৈরির কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে। সঠিকভাবে এগুলো অনুসরণ না করলে কাঙিক্ষত ফল লাভ হয় না এবং বাগান ব্যবস্থাপনায় নানা অসুবিধা দেখা দেয়। বাণিজ্যিক ফল বাগানের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য। দীর্ঘজীবী ফলের বাগান তৈরির সময় কোন ভুলত্রুটি থাকলে পরবর্তী কালে সেগুলো সংশোধন করা ব্যয়বহুল এমনকি অসম্ভব হয়ে দাড়ায়। বাণিজ্যিক ফলবাগান নিম্নোল্লিখিত বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। 

 

প্রজাতি ও জাত নির্বাচন : বাণিজ্যিক ফল বাগানের জন্য প্রজাতি ও জাত নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে এলাকায় বাগান স্থাপন করা হবে সেই এলাকার উপযোগী ফলের প্রজাতি ও জাত বেছে নিতে হবে। প্রজাতি/জাত নির্বাচন সঠিক না হলে কাঙিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।

 

জমি নির্বাচন : বেশির ভাগ ফলের গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। আবার কোন কোন ফল গাছ যেমন- কাঁঠাল, পেঁপে প্রভৃতি জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। বন্যা বা বৃষ্টির পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু জমি ফল বাগান স্থাপনের জন্য নির্বাচন করতে হবে। তবে স্বল্পকালীন জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এমন ফল মাঝারি উঁচু জমিতে রোপণ করা যেতে পারে।

 

জমি তৈরি : গভীরভাবে চাষ ও মই দিয়ে উত্তম রূপে জমি তৈরি করতে হবে। আগাছা বিশেষ করে বহুবর্ষজীবী আগাছার মধ্যে উলু ও দুর্বা গোড়া ও শেকড়সহ অপসারণ এবং জমি সমান করতে হবে।

 

চারা/কলম নির্বাচন : পরীক্ষামূলক বাগান স্থাপনের ক্ষেত্রে সঠিক চারা/কলম নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চারা নির্বাচন সঠিক না হলে বাগান থেকে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে না। চারার বয়স, রোগ বালাইয়ের আক্রমণ, সতেজতা প্রভৃতি বিষয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ এগুলো গাছের ফলন ক্ষমতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ভালো চারা/কলমের নিম্নোল্লিখিত গুণাগুণ থাকবে-

  • চারা/কলমটি হবে ভালো জাত ও অনুমোদিত উৎসের সায়ন বা বীজ থেকে উৎপন্ন
  • চারা/কলমটির কাণ্ডের দৈর্ঘ্য শিকড়ের দৈর্ঘ্যের ৪ গুণের বেশি হবে না
  • চারা/কলমের বয়স এক বা দেড় বছরের বেশি হবে না
  • চারা/কলমে ফুল/মুকুল বা ফল থাকবে না
  • চারাটি রোগ ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ মুক্ত হবে
  • কলমের চারাটি হবে ২-৩টি সুস্থ-সবল শাখাযুক্ত
  • জোড় কলমের চারার আদিজোড় এবং উপজোড়ের মধ্যে সঙ্গতি থাকতে হবে এবং সঠিকভাবে জোড়া লাগতে হবে
  •  

চারা/কলম  সংগ্রহ : ফলের চারা/কলম অবশ্যই নির্ভরযোগ্য উৎস হতে সংগ্রহ করতে হবে।  সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- বিএআরআই, ডিএই, বিএডিসি; বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- ব্র্যাক, প্রশিকা এবং বেশ কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন নার্সারি যেমন - পঞ্চগড় নার্সারি, আজাদ নার্সারি প্রভৃতি গুণগত মানসম্পন্ন এবং সঠিক জাতের চারা/কলম সরবরাহ করে থাকে। এছাড়াও আইসি-এএফআইপি কর্মসূচির আওতাধীন নার্সারি মালিক সমিতির সদস্যগণের নার্সারি হতেও চারা/কলম সংগ্রহ করা যেতে পারে।

 

ফিল্ড লে-আউট : ফলদ বৃক্ষ বহুবর্ষজীবী এবং বৃহদাকার হওয়ায় ফিল্ড লে-আউট ও চারা রোপণে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। প্রথমে রেজিস্ট্রারে চারা রোপণের নকশা তৈরি করতে হবে। সাধারণত সমভূমিতে বর্গাকার এবং পাহাড়ি জমিতে কন্টুর পদ্ধতি

অনুসরণ করা হয়। সমভূমিতে নির্বাচিত জমির যে কোন এক প্রান্তে অনুমোদিত রোপণ দূরত্বের অর্ধেক পরিমাণ অভ্যন্তরে সোজা করে বেসলাইন টানতে হবে। বেসলাইনের সাথে সমকোণে প্রান্ত থেকে রোপণ দূরত্বের অর্ধেক পরিমাণ অভ্যন্তরে আর একটি

 

লাইন টানতে হবে। দু’লাইনের সংযোগ স্থলে খুঁটি পুঁতে ১ম চারা রোপণের স্থান চিহ্নিত করতে হবে। এ খুঁটি থেকে উভয় লাইন বরাবর নির্ধারিত দূরত্বে খুঁটি পুঁতে চারা রোপণের স্থান চিহ্নিত করতে হবে। উভয় লাইনে শেষ খুঁটি বরাবর সমকোণে দুটি লাইন টানতে হবে। লাইন দুটির সংযোগ স্থলে খুঁটি পুঁতে শেষ গাছ রোপণের স্থান চিহ্নিত করুন। এ খুঁটি থেকে উভয় লাইন বরাবর নির্ধারিত দূরত্বে খুঁটি পুঁতে চারা রোপণের স্থান চিহ্নিত করুন। যে কোন বিপরীত প্রান্ত বরাবর ফিতা ধরে খুঁটি থেকে নির্ধারিত দূরত্বে খুঁটি পুঁতে অবশিষ্ট গাছ রোপণের স্থান চিহ্নিত করুন। বিপরীতমুখী দু’প্রান্ত সারি থেকে এক মিটার বাইরে আরও দুই সারি শক্ত খুঁটি গভীর করে পুঁতে রাখুন।

 

জাত বিন্যাস :  বাণিজ্যিক ফল বাগানে জাত বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক উন্নত জাতগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য বিদ্যমান।গাছের আকার, ফুল/ফলধারণ সময়, ফল আহরণ সময়, রোগবালাই ও পোকামাকড় সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নত জাতে বিস্তর পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এসব বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে রোপণ দূরত্ব, ফসল ও বালাই ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করতে হয়। সেজন্য জাত অনুযায়ী বাগানকে কয়েকটি ব্লকে ভাগ করে নিয়ে চারা রোপণ করা হলে বাগান ব্যবস্থাপনার কাজ সহজ হবে।

 

চারা রোপণের সময় : মধ্য বৈশাখ থেকে মধ্য আষাঢ় এবং ভাদ্র-আশ্বিন মাস বেশির ভাগ ফলদ বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত সময়। তবে সেচ সুবিধা থাকলে টবে বা পলিব্যাগে উৎপাদিত চারা/কলম বছরের যে কোন সময় রোপণ করা চলে। শীতকাল বা খরার সময় গাছ লাগালে এর প্রতি অধিক যত্নশীল হতে হবে। নতুবা রোপিত চারা/কলমের মৃত্যু হার বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

রোপণ দূরত্ব : জাত ভেদে একই প্রজাতির ফলে রোপণ দূরত্ব ভিন্ন হতে পারে। নিম্নের ছকে কয়েকটি উন্নত জাতের রোপণ দূরত্ব এবং উপযোগী এলাকা উল্লেখ করা হল।

 

মাদা তৈরি : চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পূর্বে গর্ত চিহ্নিতকরণ খুঁটিকে কেন্দ্র করে মাদা তৈরি করতে হবে। বড় ও মাঝারি বৃক্ষের জন্য প্রায় ৩ ফুট বাই ৩ ফুট ও ৩ ফুট  গভীর করে এবং ছোট বৃক্ষের জন্য ২৩.৫ ইঞ্চি বাই  ২৩.৫ ইঞ্চি ও ২৩.৫ ইঞ্চি গভীর করে গর্ত তৈরি করতে হবে। চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে গর্তের মাটির সাথে অনুমোদিত হারে জৈব ও অজৈব সার মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। মাটিতে রসের ঘাটতি থাকলে পানি সেচ দিতে হবে।

 

চারা রোপণ ও পরিচর্যা : মাদা তৈরির ১০-১৫ দিন পর মাদার মাটি কুপিয়ে আলগা করে লে-আউট করার সময় দু’প্রান্তে পুঁতে রাখা খুঁটি বরাবর ফিতা ধরে ১ মিটার অভ্যন্তরে ১ম চারা এবং নির্ধারিত দূরত্বে অন্যান্য চারা লাগাতে হবে। চারা লাগানোর সময় খুব সাবধানে এর গোড়ার টব/পলিব্যাগ/খড় অপসারণ করতে হবে যাতে মাটির বলটি ভেঙে না যায়। চারা এমনভাবে লাগাতে হবে যাতে এর গোড়া এক দম সোজা থাকে এবং মাটির বলটি মাদার উপরের পৃষ্ঠ থেকে সামান্য নিচে থাকে। এর পর হাত দ্বারা আলতভাবে মাটি পিষে দিতে হবে। চারাটি যাতে হেলে না যায় এবং এর গোড়া যাতে বাতাসে নড়াচড়া করতে না পারে সেজন্য চারা লাগানোর পরপরই খুঁটি দিতে হবে। খুঁটিটি সোজা করে পুঁতে এর সাথে শক্ত করে পাটের সুতলি বেঁধে চারাটি এমনভাবে বাঁধতে হবে যাতে চারা এবং খুঁটির মাঝে সামান্য দূরত্ব থাকে। গরু ছাগলের উপদ্রবের আশংকা থাকলে, সম্পূর্ণ বাগানে অথবা প্রত্যেক গাছে বেড়া দেয়ার

ব্যবস্থা করতে হবে। লাগানোর পরপরই প্রতিটি চারায় পাইপ, ঝাঝরি বা বালতির সাহায্যে পানি সেচ দিতে হবে। চারা রোপণের পর এক সপ্তাহ প্রতিদিন এবং এর পরবর্তী এক মাস ২-৩ দিন পরপর সেচ দিতে হবে।

 

গাছের মুকুল/ফুল/ফল ভাঙন : কলমের গাছ রোপণের পরবর্তী বছর থেকেই মুকুল/ফুল আসতে শুরু করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হারে ফলও হয়। কিন্তু গাছের বয়স ২-৪ বছর না হওয়া পর্যন্ত মুকুল/ফুল বা কচি ফল ভেঙে দিতে হবে। তবে জাত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য দু’একটি ফল রাখা যেতে পারে।

 

ডাল ছাঁটাইকরণ : কলমের গাছ রোপণের পর এর গোড়ার দিক অর্থাৎ আদিজোড় থেকে নতুন ডাল বের হতে থাকে। এসব ডাল দেখার সাথে ভেঙে দিতে হবে। এছাড়া গাছকে সুন্দর কাঠামো দেয়ার জন্য গোড়ার দিকে বৃক্ষভেদে ০.৫-১.৫ মিটার কাণ্ড রেখে নিচের সব ডাল ছাঁটাই করতে হবে। অনেক সময় বীজের চারায় ডালপালা না হয়ে প্রধান কাণ্ড ওপরের দিকে  বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত উচ্চতায় গাছের ডগা কেটে দিতে হবে। প্রতি বছর বর্ষার শেষে মরা, রোগাক্রান্ত ও দুর্বল ডালপালা কেটে দিতে হবে। এছাড়া গাছ বেশি ঝোপালো হলে অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

আগাছা দমন : ফল বাগান সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। বর্ষার শুরুতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এবং বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাসে বাগানে চাষ দিয়ে আগাছা দমন করা যায়। গাছের কাছাকাছি যেখানে চাষ দেয়া সম্ভব হয় না সেখানে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আগাছা দমন করতে হবে। এরপরও আগাছার উপদ্রব পরিলক্ষিত হলে বর্ষা মৌসুমে হাসুয়া বা বুশ কাটার দ্বারা কেটে এবং শীত মৌসুমে চাষ ও কোদাল দ্বারা পুনরায় আগাছা দমন করতে হবে। আগাছানাশক যেমন- রাউন্ড-আপ, পিলার্ঙন প্রয়োগ করেও  বাণিজ্যক বাগানে আগাছা দমন করা যায়।

 

সার প্রয়োগ : বাড়ন্ত গাছের দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অনুমোদিত মাত্রায় সার দু’মাস অন্তর সমান কিস্তিতে গাছের গোড়া থেকে সামান্য দূরে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বর্ষা মৌসুমে ডিবলিং পদ্ধতি অনুসরণ করা উত্তম। ফলন্ত গাছে সাধারণত বছরে দু’বার সার প্রয়োগ করতে হয়। বর্ষার শুরুতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে দু’এক পশলা বৃষ্টি হওয়ার পর মাটিতে রস এলে ১ম কিস্তি এবং বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাসে বৃষ্টির পরিমাণ কমে এলে ২য় কিস্তির সার প্রয়োগ করতে হয়। দুপুর বেলায় যে পর্যন্ত ছায়া পড়ে তার থেকে সামান্য ভেতরে নালা তৈরি করে নালায় সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। অথবা গাছের গোড়ার ১.০-১.৫ মিটার বাদ দিয়ে দুপুর বেলায় যে পর্যন্ত ছায়া পড়ে সেই এলাকায় সার ছিটিয়ে কোদাল দ্বারা কুপিয়ে বা চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। পেয়ারা, কুল, লেবু জাতীয় ফল প্রভৃতি গাছের নতুন ডালে ফুল ও ফল হয়। এসব ক্ষেত্রে শীতের শেষে মাঘ-ফাগুন মাসে আরও এক কিস্তি সার প্রয়োগ করা উত্তম।

 

পানি সেচ ও নিষ্কাশন : শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিশেষ করে ফল ধারণের পর এবং ফলের বাড়ন্ত অবস্থায় ২-৩টি সেচ প্রয়োগ করা আবশ্যক। প্লাবন সেচ না দিয়ে রিং বা বেসিন পদ্ধতি অবলম্বন করা হলে পানি সাশ্রয় হবে। বর্ষা মৌসুমে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা অতীব জরুরি। এজন্য বর্ষার শুরুতেই বিভিন্নমুখী নিষ্কাশন নালা তৈরি করতে হবে।

রোগবালাই ও পোকামাকড় এবং তাদের দমন ব্যবস্থাপনা

ফলদ গাছের প্রতিষ্ঠাকালে বেশ কিছু রোগ ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এজন্য ঘন ঘন বাগান পরিদর্শন এবং প্রতিটি গাছ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। 

 

মিলিবাগ ও স্কেল পোকা : এসব পোকা চারা গাছের কচি ডালের সাথে লেপ্টে থাকে এবং রস শুষে খায় ও হানিডিও নির্গত করে শুটি মোল্ড রোগের সৃষ্টি করে।

 

প্রতিকার : আক্রমণের প্রথম দিকে পোকাসহ আক্রান্ত পাতা/কাণ্ড সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে অথবা পুরনো টুথব্রাশ দিয়ে আঁচড়িয়ে পোকা মাটিতে ফেলে মেরে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি. তরল সাবান এবং/অথবা এডমায়ার ২০০ এসএল ০.২৫ মিলি. হারে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার সেপ্র করতে হবে।

 

চ্যাফার বিটল : বয়স্ক পোকা চারা গাছের কচি পাতা খেয়ে ঝাজরা করে ফেলে। ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

প্রতিকার : বাগান বিশেষ করে রোপণকৃত চারার চারপাশ সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। গাছে কচি পাতা বের হওয়ার সময় প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০মিলি. হারে ফেনিট্রোথিয়ন (সুমিথিয়ন/অন্য নামের) ৫০ ইসি কীটনাশক মিশিয়ে কচি পাতায় সেপ্র করতে হবে।

 

উঁইপোকা : উঁইপোকা দলবদ্ধভাবে চারা গাছের শিকড় কেটে দেয় এবং শিকড়ের ভেতর গর্ত করে খায়। ফলে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। নতুন রোপিত নারিকেল চারার গোড়ার নারিকেল ও শিকড় খেয়ে ফেলে। এতে গোড়া আলগা হয়ে চারাটি মারা যায়।

 

প্রতিকার : ডারস্বান ২০ ইসি বা পাইরিফস ৪০ ইসি ৩০ মিলি. প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছের গোড়ার মাটিতে সেপ্র করতে হবে।

 

আমের পাতা কাটা উইভিল : এ পোকা চারাগাছের কচি পাতার বোটার কাছাকাছি কেটে পাতাটি মাটিতে ফেলে দেয়। এতে গাছের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

 

প্রতিকার : মাটি থেকে নতুন কাটা পাতা সংগ্রহ করে ধবংস করতে হবে। গাছে কচি পাতা বের হওয়ার সাথে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি. হারে ফেনিট্রোথিয়ন (সুমিথিয়ন/অন্য নামের) ৫০ ইসি কীটনাশক মিশিয়ে কচি পাতায় সেপ্র করতে হবে।

 

আমের ভেজিটেটিভ ম্যালফরমেশন : বিকৃতি সাধারণত ২ প্রকার। যথাঃ অঙ্গজ বিকৃতি এবং মঞ্জুরি বিকৃতি অঙ্গজ বিকৃতি ছোট চারাগাছে এবং মঞ্জুরি বিকৃতি দেখা যায় ফলন্ত্ত  পর্যায়ে। ছত্রাকজনিত (ফিউজেরিয়াম মনিলিফরমি) রোগের কারণে বাড়ন্ত চারা গাছের ডগায় অসংখ্য কুঁড়ি দেখা যায় এবং গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।

 

প্রতিকার : গাছের আক্রান্ত অংগ ছাঁটাই করতে হবে। বেনলেট ১ মি.লি. প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। অক্টোবর মাসে ২০০ পিপিএম ঘঅঅ নামক হরমোন স্প্রে করতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে চারা সংগ্রহ করতে হবে।

 

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প