ধান চাষ ব্যবস্থাপনা

ধান বাংলাদেশের প্রধান ফসল। বাংলাদেশ পৃথিবীর ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। এ দেশে ধানের গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৪.০১ টন। অথচ চীন-জাপানে তা ৫-৬ টন। ভাল জাতের ভাল বীজ, পরিমিত বয়সের চারা রোপণ, সুষম সার ব্যস্থাপনা, সমণ্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মাধ্যমে এই ফলন তারতম্য কমিয়ে আনা সম্ভব।

জাতের বৈশিষ্ট্য
অধিক ফলন ও লাভের জন্য এলাকা ভিত্তিক চাষ উপযোগী সঠিক জাত নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাল বংশ ও মা ছাড়া যেমন ভাল সন্তান আশা করা যায় না তেমনি ভাল জাতের ভাল বীজ ছাড়া উত্তম ফসল পাওয়া যায় না। নানা জাতের বীজের মধ্যে তাই সঠিক জাতটি নির্বাচন করে চাষ করা একজন কৃষকের প্রাথমিক দায়িত্ব। বর্তমানে বাংলাদেশে হাইব্রিড, উফশী ও নানা ধরনের আধুনিক জাতের ধান চাষ করা হচ্ছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লক্ষ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের আবাদ হচ্ছে। তবে কৃষকদের কাছে সব জাতের গ্রহণযোগ্যতা সমান নয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) থেকে উদ্ভাবিত এ পর্যন্ত চারটি হাইব্রিডসহ ৬৫টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। তাছাড়াও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিনা) থেকে ১৩টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এগুলো হলো-বিনাশাইল, বিনা ধান-৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত দু’টি জাত বিএইউ ৬৩ (ভরসা) এবং বিএইউ ২ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নীচে এ দেশে ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:
 
বিআর ১: বোরো ও আউশ মৌসুমে  আবাদযোগ্য এ ধানের জনপ্রিয় নাম চান্দিনা । কোন কোন অঞ্চলে এ ধান ৫৩২ আবার কোথাও কেবল  ৭৬ নামে পরিচিত । চান্দিনা একটি আগাম জাত ।
বিআর ২ : এ ধানের জনপ্রিয় নাম মালা । এ ধানের মুড়ি  খুব ভাল হয়। মালা বোরো এবং রোপা আউশের একটি জাত।
বিআর ৩ : এ ধানের জনপ্রিয় নাম বিপ্লব। এটি নাবী জাত হলেও বোরো মৌসুমে ফলনের জন্য সুখ্যাত। জাত রোপা আউস এবং রোপা আমন মৌসুমেও ভাল ফলন দেয়।
বিআর ৪ : এ ধানের জনপ্রিয় নাম ব্রিশাইল। এটি একটি আলোক-সংবেদনশীল জাত। তাই কেবল রোপা আমন মৌসুমে চাষাবাদ  করার জন্য উপযোগী। এ ধানের বীজ বপনের সবচেয়ে ভাল সময় হলো আষাঢ় মাস। এ সময় বীজ বপন করলে শ্রাবণের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত সময়ে চারা রোপণ করা যায়। কার্তিকের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহে ফুল ফোটে। অগ্রহায়ণের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে ধান পাকে।
বিআর ৫ : আমন মৌসুমের এ ধানের জনপ্রিয়তা নাম দুলাভোগ। এর চালের কালিজিরা চালের মতো সুগন্ধ আছে বলে পোলাও এবং পায়েশ তৈরির জন্য খুবই উপোযোগী। এটি আলোক-সংবেদনশীল, তাই এর চাষাবাদ রোপা আমন মৌসুমের জন্য নির্ধারিত।
বিআর ৬ : বোরো ও আউশ  মৌসুমের জাত। ব্রি এ ধানটি ইরি থেকে সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আশানুরুপ ফলন পাওয়ায় বিআর ৬ নামে অনুমোদন পায়। এটি একটি আগাম জাত।
বিআর ৭: ঝড়-ঝঞ্ঝা কম হয় এমন অঞ্চলে এ ধান রোপা আউশ ও বোরো মৌসুমের জন্য উপযোগী। কারণ ধান বেশি পেকে গেলে ঝড়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। তাই এ ধান  পাকার সাথে সাথে কর্তন করতে হবে। এর চালের আকার প্রায় বাসমতির মতো, তবে এতে সুগন্ধি নেই।
বিআর ৮: এ জাতের জনপ্রিয় নাম আশা। বোরো এবং আউশ মৌসুমের এ জাত ধান শীষের সাথে শক্তভাব লেগে থাকে । তাই ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং শিলা বৃষ্টি-প্রবণ এলাকার জন্য এ ধান বিশেষ উপযোগী।
বিআর ৯: বোরো ও আউশ  মৌসুমে চাষের উপযোগী। বিআর ৯ এর জনপ্রিয় নাম সুফলা। এ জাতে ধান শীষের সাথে শক্তভাবে লেগে থাকে তবে আশা ধানের চেয়ে মজবুতি কিছু কম। এ জাত শিলাবৃষ্টি-প্রবণ এলাকার জন্য খুবই উপযোগী।
বিআর ১০: এ ধানের জনপ্রিয় নাম প্রগতি। এজাতটি সহজে চেনা যায। কারণ ফুল ফোটার সময় শীষগুলো ডিগপাতার নিচে থাকে এবং ডিগপাতার শেষ প্রান্ত হঠাৎ করেই সুচালো। প্রগতিকে রোপা আমনের নাবী জাতের তালিকায় ফেলা যায়। জাতটিতে আলোক-সংবেদনশীলতা আছে। এ কারণে রোপণের জন্য ৪০-৫০ দিনের চারা ব্যবহার করা যায়। তখন চারা বেশ লম্বা হয় এবং হাঁটু পানিতে সহজেই রোপণ করা যায়। এ সব সুবিধার জন্য  খুলনার লবণাক্ত এলাকায় রোপা আমন মৌসুমে জাতটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ জাতের লবণাক্ত সহনশীলতা  নেই, কিন্তু রোপা আমনে লবণাক্ত অঞ্চলে ক্ষেতে ২০-৩০ সেমি: গভীর পানি থাকায় লবণাক্ত মাত্রা ধানের ক্ষতিকারক পর্যায় (৪ডিএস/মিটার) এর নিচে থাকে। স্বল্প আলোক সংবেদনশীলতার জন্য এ জাত জ্যৈষ্ঠের ২০-২৫ তারিখে বপন করলে কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ে ফসল কর্তন করা যায়। ফলে ঐ জমিতে সময় মতো গম, ডাল ও তেল ফসল আবাদ করা যায়।
বিআর ১১: এধানের জনপ্রিয় নাম মুক্তা। এ ধানের ফুল ফোটার সময় শীষ ডিগপাতার উপরে থাকে এবং সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। আমন মৌসুমের এ জাতটি সারা দেশে জনপ্রিয়। মুক্তা ধান স্বল্প আলোক সংবেদনশীলতাবিশিষ্ট। স্বল্প আলোক সংবেদনশীলতার জন্য এ জাত জ্যৈষ্ঠের ২০-২৫ তারিখে বপন করলে কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ে ফসল কাটা যায়; ফলে ঐ জমিতে সময়মতো গম, ডাল ও তেল ফসল আবাদ করা যায়।
বিআর ১২: বোরো ও আউশ মৌসুমের এ ধানের জনপ্রিয় নাম ময়না। এ ধানের গাছের নিচের অংশে বেগুনী রঙ দেখে জাতটি সহজে চেনা যায়। এ জাতটি দেশের যে সকল অঞ্চলে আগাম রোপা আউশ হয় ঐ সব এলাকার জন্য খুবই ভাল জাত।
বিআর ১৪: এর জনপ্রিয় নাম গাজী। বোরো ও আউশ মৌসুমের এ জাত ছড়া বের হবার পর ডিগপাতা কিছুটা হেলে যায়; ফলে শীষ উপরে দেখা যায় এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করে।  ছড়ার উপরি ভাগের ধানে হেলে শুঙ আছে। ধানের গাছ বেশ উঁচু এবং খুব মজবুত, তাই ধান পাকার সময় মাঠ কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায় না। এ জন্যে দেশের বিল অঞ্চলে বোরো মৌসুমে এটি খুবই জনপ্রিয়।
বিআর ১৫: বোরো ও আউশ মৌসুমে চাষাবাদের জন্য বিআর ১৫ নামে অনুমোদন লাভ করে। এর জনপ্রিয় নাম মোহিনী । এ জাতের চাল প্রায় স্থানীয় শানীয় ধানের মতো, কিন্তু এটি নাবী জাত।
বিআর ১৬: বোরো ও আউশ মৌসুমের এ ধানের জনপ্রিয় নাম শাহীবালাম। এ ধানের চাল পুরানো আমলের বালাম সমমানের এবং বর্তমানে মুড়ি তৈরি জন্য খ্যাতি লাভ করেছে।
বিআর ১৭: ব্রি এ জাতটিকে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ হাওড় এলাকার উপযোগী বলে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে বোরো মৌসুমে চাষের জন্য এ জাতটি অনুমোদন লাভ করে। এ ধানের জনপ্রিয় নাম হাসি । এ জাতের গাছ বেশ  উঁচু ও কান্ড শক্ত। ফুল ফোটার সময় এ ধানের শীষগুলো ডিগপাতার উপরে  থাকে বলে সহজেই দৃষ্টি অকর্ষণ করে  এবং  জাতটির জীবনকাল মাধ্যম মেয়াদী।
বিআর ১৮: ব্রি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর করে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ  হাওড় এলাকার উপযোগী বলে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে। বোরো ও মৌসুমে এ জাতটি বিআর ১৮ নামে অনুমোদন লাভ করে। এ ধানের জনপ্রিয় নাম শাহজালাল। এ জাতের গাছ বেশ  উঁচু  ও কান্ড মজবুত এবং নাবী।
বিআর ১৯: জাতটি ধান পরীক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্রি-তে আসে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এটি হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ  হাওড় এলাকার উপযোগী বলে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয। বোরো মৌসুমের এ জাতটি বিআর ১৯ নামে অনুমোদন লাভ করে। এ ধানের জনপ্রিয় নাম মঙ্গল। এর ডিগপাতা ছোট এবং কান্ডের সাথে আড়াআড়িভাবে অবস্থান করে। ফুল ফোটার সময় শীষ উপরে থাকে এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ জাতের গাছ বেশ উঁচু এবং ধান পাকা পর্যন্ত খাড়া থাকে এবং নাবী।
বিআর ২০: এ ধানের জনপ্রিয় নাম নিজামী। এ জাতের ধানে অনেক সময় দাগ দেখা যায় । জাতটি ছিটিয়ে, লাইন করে  এবং ডিবলিং করা যায়। বোনা আউশের এ জাতটি দেশের বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে, বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ময়মনসিংহ জেলার জন্য উপযোগী।
বিআর ২১: এ ধানের জনপ্রিয় নাম নিয়ামত। জাতটি ছিটিয়ে,লাইন করে এবং ডিবলিং পদ্ধতিতে বোনা যেতে পারে। বোনা আউশের এ জাতটি দেশের বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে, বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ময়মনসিংহ জেলার জন্য উপযোগী।
বিআর ২২: আমন মৌসুমের উপযোগী। এ ধানের নাম কিরণ। এটি একটি আলোক সংবেদনশীল নাবী জাত। ঠিক নাইজারশইলের মতো। এর চাল আর নাইজারশাইলের মধ্যে পার্থক্য নেই বললেই চলে; আবার ফলনও হয় দ্বিগুণ। দেশের বন্যাপ্রবণ এলাকায় বন্যা পরবর্তী সময়ে যে জমিতে যেভাবে নাইজারশাইলের চারা রোপণ করা হয় সে সময়ে ওই জমিতে একই নিয়মে কিরণ রোপণ করা যাবে। কিরণে প্রতি হেক্টর ১ টন ফলনও বেশি পাওয়া যাবে। রোপণের পর কিছু পরিচর্যা, যেমন জমিতে পানি সংরক্ষণ ও পরিমাণ মতো নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করতে হয়। জোয়ার-ভাটা অঞ্চলে কিরণ ধানের ৪০-৫০ দিনের চারা ১-১৫ আশ্বিন পর্যন্ত রোপণ করা যায়। ১৫ আশ্বিনের পর এ ধান রোপণ করা উচিত নয়। প্রচলিত কুমড়াগইর, সাদামোটা ইত্যাদি ধানের সাথেই ধান কাটা যায় এবং প্রতি হেক্টরে কমপক্ষে ১ টন ফলন বেশি পাওয়া যায়।
বিআর ২৩: এ ধানের জনপ্রিয় নাম দিশারী। এ ধানের চারা ও গাছ বেশ উঁচু ও কান্ড খুবই শক্ত। এটি একটি আলোক-সংবেদনশীল নাবী জাত। তাছাড়া এ ধান কিছুটা লবনাক্ততা সহনশীল। এসব গুণাবলীর  জন্য জাতটি খুলনা  ও বাগেরহাট অঞ্চলে রোপা আমনে খুবই জনপ্রিয়। বিআর ২২ ধানের মতোই বিআর ২৩ বন্যা-পরবর্তী এবং জোয়ার ভাটা অঞ্চলে নাবী রোপা আমন হিসেবে চাষাবাদের জন্য উপযোগী।
বিআর ২৪: আউশ মৌসুমের উপযোগী। এ ধানের জনপ্রিয় নাম রহমত। এ জাতের গাছ খুবই শক্ত। ফুল ফোটার সময় শীষ ডিগপাতার উপর থাকে এবং সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ধানের চাল খুবই সুন্দর। জাতটি ছিটিয়ে, লাইন করে  এবং ডিবলিং  পদ্ধতিতে বোনা যায়। রহমত কেবল বৃষ্টিবহুল এলাকার  জন্য উপযোগী।
বিআর ২৫: আমন মৌসুমের উপযোগী এ ধানের জনপ্রিয় নাম নয়াপাজাম। এ ধানের রং ও আকৃতি এবং চালের আকার একদম পাজামের মতো। উপরন্তু এ ধান ৫-৭ দিন আগাম, গাছ অনেক মজবুত এবং ফলন দেয় বেশি। এ ধানের জীবনকাল মধ্য মেয়াদী। তাই আষাঢ়ের শুরুতে বপন করলে কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ে কেটে রবি ফসল চাষাবাদ করা যায়।
বিআর ২৬: বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এটিকে রোপা আউশের জাত হিসেবে চুড়ান্তভাবে নির্বচান করা হয়। এ ধানের জনপ্রিয় নাম শ্রাবণী। এটি আগাম জাত। এর কান্ড শক্ত এবং ফুল ফোটার সময় শীষ ডিগপাতার উপর থাকে। তাই সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর চাল বালামের অনুরূপ। কিন্তু ভাত নরম ও কিছুটা আঠালো। ধান শুকানোর পর দুই তিন মাস  সংরক্ষণ করলে আঠালো ভাব অনেকাংশে দুরীভুত হয় ।
ব্রি ধান ২৭: ধানের গোড়ার দিকে পাতার খোল কিছুটা বেগুনি রঙের এবং ধানের মাথায় বেগুনি রঙের ফোঁটা আছে। ধান পাকার সাথে সাথে এ ফোঁটা ঝরে পড়ে যায়। এ জাতের গাছ উঁচু হলেও কিছুটা ঢলে পড়া প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। স্থানীয় জাত গুলো যখন ধান পাকার আগেই ঢলে পড়ে যায় তখন এ ধান মজবুতির সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। বরিশাল পটুয়াখালী জেলার অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা কবলিত জমিতে বোনা ও রোপা আউশ হিসেবে চাষাবাদের জন্য জাতটি খুবই উপযোগী।
ব্রি ধান ২৮: এটি বোরো মৌসুমের আগাম জাত হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। এ ধানের ডিগপাতা হেলে যায় এবং শীষ উপরে  থাকে; ফলনেও ভাল তাই এর জনপ্রিয়তা ঘরে ঘরে।  
ব্রি ধান ২৯: এটা বোরো মৌসুমের আগাম নাবী জাতের ধান। এর সার গ্রহণ ক্ষমতা যেমন বেশি তেমনে কান্ড মজবুত আর ফলনের পরিমাণ সর্বোচ্চ গুনে ও মানে ব্রি ধান ২৯ সকল আধুনিক ধানের সেরা।
ব্রি ধান ৩০ : আমন মৌসুমের এ জাতের ধানের আকার, রঙ, গাছের এবং জীবনকাল প্রায় বিআর-১০ এর মতো। পার্থক্য শুধু ডিগপাতায় যা শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ক্রমশ সুচালু। এর স্বল্প আলোক সংবেদনশীলতা আছে। তাই এর আবাদ পদ্ধতি বিআর ১০ এর অনুরূপ।  
ব্রি ধান ৩১ : আমন মৌসুমের এ ধানে মৃদু আলোক-সংবেদনশীলতা থাকলেও বিআর ১১ এর চেয়ে ৫-৬ দিন আগাম। ধানের রঙ ও আকৃতি বিআর ১১ এর মতোই, তবে আকারে একটু বড়। শীষ দেখতে আকর্ষণীয়, ধানের গাঁথুনি ঘন এবং শীষের গোড়ায় কিছু চিটা হয়। এ ধানের চাষাবাদ বিআর ১০ বা বিআর ১১ এর অনুরূপ।
ব্রিধান ৩২ : জাতটি আলোক-সংবেদনশীল নয় বলে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের মধ্যে যখনই বীজ বপন করা হোক না কেন এর জীবনকাল ১৩০ দিন। এ সুবাদে জমিভেদে এ জাতের বপন-রোপণ নির্ধারণ করে অতি সহজেই রবি ফসল, যেমন গম, সরিষা ইত্যাদি সঠিক সময়ে বপন করা যায়। এ ধান গাছের মজবুতি কিছুটা কম বলে ঢলে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারে তা অনেকটা প্রতিরোধ করা যায়। আবার ভাদ্রেও প্রথম সপ্তাহে রোপণ করলে গাছের উচ্চতা কমে এবং কান্ডের মজবুতি বাড়ে।
ব্রি ধান ৩৩: এটি রোপা আমনের সবচাইতে আগাম জাত এবং কোন আলোক সংবেদনশীলতা নেই এ জন্য ব্রি ধান-৩২ এর মতো এ ধানের চাষাবাদের পর অনায়াসেই সব রকম রবি ফসল করা যায়। এর কান্ড মজবুত। গাছের পাতা প্রচলিত জাতের চেয়ে সামান্য চওড়া এবং ডিগপাতায় আগার দিক থেকে ২-৩ সেন্টিমিটার নিচে কোঁচকানো ভাঁজ আছে। ধানের খোসায় ভাঁজে ভাঁজে হালকা বাদামি রঙ আছে। এ জাতটি আগাম তাই এর বীজ বপনের তারিখটি তালিকা ২ দেখে নিতে হবে। আগাম বপন করলে আগাম পাকবে। তবে তাতে ইঁদুর, পোকা, বৃষ্টি ইত্যাদিতে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকবে।
ব্রি ধান ৩৪: এটি একটি সুগন্ধি জাত। এ ধান কালিজিরা ধানের মতো ছোট এবং ঘ্রাণ কালিজিরার কাছাকাছি। আমন মৌসুমের এ ধানের চাল পোলাও তৈরির জন্য খুবই উপযোগী। এ ধানে আলোক সংবেদনশীলতা আছে। গাছ বেশ দুর্বল। তাই ফলন বৃদ্ধিও জন্য এর বপন কিছুটা পরে অর্থাৎ শ্রাবণের দ্বিতীয় সপ্তাহে করা উচিত।
ব্রি ধান ৩৫: এটি বাদামি গাছফড়িং প্রতিরোধশীল জাত হিসেবে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন লাভ করে।
ব্রি ধান ৩৬: এটি ঠান্ডা সহিষ্ণু বোর ধানের জাত হিসেবে নির্বাচন করা হয় এবং ব্রি ধান ৩৬ নামে অনুমোদন লাভ করে। ব্রি ধান-২৮ এর মতোই এটি একটি আগাম জাত এবং চাল বালামের মতো।
ব্রি ধান ৩৭: রোপা আমন মৌসুমের এ ধানের গাছ কাটারিভোগের চেয়ে অনেক মজবুত, কিন্তু ৫-৭ দিন নাবী। ধানের রঙ, চালের আকার ও ঘ্রাণ ঠিক কাটারিভোগের অনুরূপ।এ ধানের শীষ দেখতে আকর্ষণীয় এবং শীষে ধানের গাঁথুনি বেশ ঘন। ধানের শেষপ্রান্ত একটু বাঁকা এবং সুচালো থেকে ছোট শুঙ দেখা যায়। এর ভাত ও পোলাও কাটারিভোগের সমতুল্য। জাতটি আলোক সংবেদনশীল। অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে শ্রাবণের দ্বিতীয় সপ্তাহে বীজ বপন করা এবং প্রয়োজনে সম্পূরক সেচ দিতে হবে।
ব্রিধান ৩৮:  এর গাছ বাসমতি (ডি)-এর চেয়ে অনেক মজবুত। ধানের রঙ ও শুঙ সোনালী সাদা। ব্রিধান ৩৮ এর চাল ও ঘ্রাণ বাসমতি (ডি) এর অনুরূপ। ভাত ও পোলাও দুটোই খুব সুন্দর। এ ধানের চালে সুগন্ধি আছে। রোপা আমনের এ জাতটি আলোক সংবেদনশীল। অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে শ্রাবণের দ্বিতীয় সপ্তাহে বীজ বপন করা এবং প্রয়োজনে সম্পূরক সেচ দিতে হবে।
ব্রিধান ৩৯: রোপা আমন মৌসুমের উপযোগী এ ধানের কান্ড মজবুত, তাই ঢলে পড়ে না। প্রচলিত জাতের চেয়ে এর ডিগপাতা একটু চওড়া এবং খাড়া। ব্রিধান ৩২ ও ব্রি ধান ৩৩ এর মতো এ জাতের বীজ বপন ও রোপণের তারিখ নির্ধারণ করে পরবর্তী রবি ফসল করা যায়। তবে এ জাতের ধান কোন ক্রমেই শ্রাবণ মাস শুরু হওয়ার আগে বপন করা উচিত নয়; কারণ জাতটি ফুল ফোটার সময় উচ্চতাপ সহনশীল নয়।
ব্রি হাইব্রিড ধান ১: ব্রি উদ্ভাবিত প্রথম হাইব্রিড ধানের জাতটি ব্রি ধান ২৯ এর চেয়ে প্রায় ১ টন বেশি ফলন দেয়। এটি যশোর ও বরিশাল অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন লাভ করে। এর কান্ড ও পাতা ঘন সবুজ ও খাড়া। কান্ড শক্ত বলে গাছ হেলে পড়ে না। এ ধানের চাষাবাদ পদ্ধতি একটু আলাদা।
ব্রি ধান ৪০ : এটি একটি সংবেদনশীল ধান। এ ধান চারা ও থোড় অবস্থায় ৮ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা প্রতিরোধ করতে পারে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের যে জমিতে রাজাশাইল, কাজলশাইল, পাটনাই, মরিচশাইল ইত্যাদি স্থানীয় জাতের চাষাবাদ হচ্ছে ঐ সব জমিতে এ জাতের প্রতি হেক্টরে ফলন ৪.০-৪.৫ টন। এ জাতের গাছ মজবুত। প্রচলিত জাতের মতো এর ডিগপাতা একটু চওড়া, কিন্তু গাছ উচ্চতায় অনেকটা ছোট। এ জাতের জীবনকাল কাজলশাইলের সমান এবং পাটনাই ও মরিচশাইলের চেয়ে ৮-১৫ দিন আগাম। জাতটি আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় প্রয়োজনে ৩০-৫০ দিনের চারা এক হাঁটু পরিমাণ(২৫-৩০ সেন্টিমিটার) পানিতে সহজেই রোপণ করা যায়। চালের পেটে কিঞ্চিত সাদাটে দাগ আছে। ধান সিদ্ধ করলে তা থাকে না। এর শীষের অগ্রভাগের কোন কোন ধানে শুঙ থাকে।
ব্রি ধান ৪১: এটি রোপা আমন মৌসুমের উপযোগী একটি আলোক সংবেদনশীল ধান। এ ধান চারা ও থোড় অবস্থায় ৮ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা প্রতিরোধ করতে পারে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের যে জমিতে রাজাশাইল, কাজলশাইল, পাটনাই, মরিচশাইল ইত্যাদি স্থানীয় জাতের চাষাবাদ হচ্ছে ঐ সব জমিতে এ জাতের প্রতি হেক্টরে ফলন ৪.০-৪.৫ টন। এ জাতের গাছ মজবুত। প্রচলিত জাতের মতো এর ডিগপাতা একটু চওড়া, কিন্তু গাছ উচ্চতায় অনেকটা ছোট। এর জীবনকাল ব্রি ধান ৪০-এর চেয়ে এক সপ্তাহ নাবী। জাতটির চারা প্রয়োজনে ৩০-৫০ দিনের হলে এক হাঁটু পরিমাণ পানিতে সহজেই রোপণ করা যায়। ধানে কোন শুঙ নেই। আবার দেখতে বিআর ২৩ এর অনুরূপ, কিন্তু জীবনকাল ৮-১০ দিন আগাম।
ব্রি ধান ৪২: ফলন প্রতি হেক্টর ৩.৫ টন। এটি বোনা আউশের আগাম জাত এবং মোটামুটি ক্ষরা সহিষ্ণু। বোনা আউশ মৌসুমে দেশের খরাপ্রবণ এলাকা বিশেষ করে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা এবং বৃষ্টিবহুল উভয় এলাকায় চাষাবাদের জন্য জাতটি উপযোগী। এটি ছিটিয়ে, লাইন করে ও ডিবলিং পদ্ধতিতে বোনা যায়।
ব্রি ধান ৪৩: ফলন প্রতি হেক্টর ৩.৫ টন। এর কান্ড শক্ত। তাই সহজে বাতাসে গাছ হেলে পড়ে না। শীষের উপরি ভাগের ২-৪ টা ধানের ছোট শুঙ দেখা যায়। জাতটি মোটামুটি খরা সহিষ্ণু এবং আগাম বোনা আউশ মৌসুমে দেশের খরাপ্রবণ এলাকা বিশেষ করে ঝিনাইদহ,কুষ্টিয়া, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা এবং বৃষ্টিবহুল উভয় এলাকার জন্য জাতটি উপযোগী। এটি ছিটিয়ে,লাইন করে এবং ডিবলিং পদ্ধতিতে বপন করা যায়।
ব্রি ধান ৪৪: এটি দেশের জোয়ার ভাটা অঞ্চলের একটি রোপা আমন ধানের জাত। এ ধান দক্ষিণ অঞ্চলের কৃষকদের কাছে জনপ্রিয়। বিআর ১১-এর মতোই এ ধান স্বাভাবিক রোপা আমনে চাষ করা যায়, তবে অলবণাক্ত জোয়ার ভাটা এলাকায় যেখানে ৫০-৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত জোয়ারের পানি আসে সেখানে চাষের উপযোগী। জাতটি কিছুটা টুংরো রোগ প্রতিরোধী। স্থানীয় জাত মৌ লতার চেয়ে এর ফলন প্রায় দ্বিগুণ এবং জোয়ার ভাটা প্রবণ জমিতে বিআর ১১ ও ব্রিধান ৩১ এর চেয়ে ফলন প্রতি হেক্টরে ১ টন বেশি। জাতটি বিআর ১১ এর চাইতে ১০-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হওয়া সত্বেও কান্ড শক্ত থাকায় সহজে হেলে পড়ে না। এর চাল মোটা হওয়ায় এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকের কাছে প্রিয়।
ব্রি ধান ৪৫: এটি বোরো মৌসুমে আগাম জাত হিসেবে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন লাভ করে। এর গাছ ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে অধিক মজবুত। ডিগপাতা লম্বা এবং খাড়া। এর জীবনকাল ব্রি ধান ২৮- এর সমান, কিন্তু ফলন বেশি।
ব্রি ধান ৪৬: রোপা আমন মৌসুসের উপযোগী। এ জাতটি আলোক সংবেদনশীলতায় ঠিক নাইজারশাইলের মতো। তাই দেশের বন্যা প্রবণ এলাকায় এর নাবীতে রোপণের উপযোগিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, ১০-১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৫-৩০ দিনের চারা রোপণ করলে প্রচলিত নাইজারশাইল এবং বিআর ২২-এর চেয়ে ব্রি ধান ৪৬ প্রতি হেক্টরে ১.০-১.৫ টন ফলন বেশি দেয়। কিন্তু জীবনকাল বিআর ২২-এর সমান। এ জাতের গাছের আকৃতি ও ধান দেখতে বিআর ১১ এর মতো। জাতটি নাবীতে রোপণ ছাড়াও প্রচলিত রোপা আমনের জাত হিসেবেও চাষাবাদ করা যায়।
ব্রি ধান ৪৭: এ জাতটি সাতক্ষীরার লবণাক্ত এলাকায় বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য নির্বাচন করা হয়। জাতটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মিটার এবং বাকি জীবনকালব্যাপী ৬ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। জাতটির ডিগপাতা ব্রি ধান ২৮- এর চেয়ে চওড়া, খাড়া এবং লম্বা। এর চালের পেটে সাদা দাগ আছে তবে ধান সিদ্ধ করলে ঐ সাদা দাগ থাকে না। এ জাতটি লবণাক্ত অঞ্চলের যেখানে সেচের পানির লবণাক্ততা মাত্রা ৪ ডিএস/মিটার পর্যন্ত আছে সেখানে অনায়াসেই বোরো মৌসুমে এর আবাদ করা যাবে।
ব্রি ধান ৪৮: ধারে জাত ও অবমুক্তির বছর ২০০৮ মৌসুম আউশ, উচ্চতা ১০৫ সেমি, জীবনকাল ১১০ দিন,জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি মোটা, ভাত ঝরঝরে, ধানের গড় ফলন ৫.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৪৯: ধারে জাত ও অবমুক্তির বছর ২০০৮ মৌসুম আমন, উচ্চতা ১০০ সেমি, জীবনকাল ১৩৫ দিন,জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি চিকন, নাইজারশাইলের মতো এবং বিআর ১১ থেকে ৭ দিন আগাম, ভাত ঝরঝরে, ধানের গড় ফলন ৫.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫০: ধারে জাত ও অবমুক্তির বছর ২০০৮ (বাংলামতি) মৌসুম বোরো, উচ্চতা ৮২ সেমি, জীবনকাল ১৫৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল লম্বা,চিকন, সুগন্ধি ও সাদা, ধানের গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫১: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১০ (আমন) মৌসুম, উচ্চতা ৯০ সেমি, জীবনকাল ১৪২ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা, ধানের গড় ফলন ৪.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫২: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১০ আমন মৌসুম, উচ্চতা ১১৬ সেমি, জীবনকাল ১৪৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি মোটা, ধানের গড় ফলন ৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৩: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১০ আমন মৌসুম, উচ্চতা ১০৫ সেমি, জীবনকাল ১২৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি চিকন, ধানের গড় ফলন ৪.৫। চারা ও প্রজনন অবস্থায় ৮-১০ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহনশীল।
ব্রি ধান ৫৪: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১০ আমন মৌসুম, উচ্চতা ১১৫ সেমি, জীবনকাল ১৩৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি চিকন, চারা ও প্রজনন অবস্থায় ৮-১০ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহনশীল। ফলন ৪.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৫: (বোরোমৌসুম) জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১১ (বোরো) মৌসুম, উচ্চতা ১০০ সেমি, জীবনকাল ১৪৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল চিকন ও লম্বা, মধ্যম মানের, ধানের গড় ফলন ৭.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৫: (আউশ মৌসুম), বছর ২০১১ মৌসুম, উচ্চতা ১০০ সেমি, জীবনকাল ১০৫ দিন, লবণাক্ততা, খরা ও ঠান্ডা সহনশীল, ধানের গড় ফলন ৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৬ : জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১১ (আমন) মৌসুম, উচ্চতা ১১৫ সেমি, জীবনকাল ১১০ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল লম্বা, মোটা ও রঙ সাদা এবং খরা সহনশীল, প্রজনন পর্যায়ে ১৪-২১ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। ধানের গড় ফলন ৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৭ : জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১১ (আমন) মৌসুম, উচ্চতা ১১৫ সেমি, জীবনকাল ১০৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল লম্বা, সরু চাল এবং খরা পরিহারকারী, প্রজনন পর্যায়ে ১০-১৪ দিন বৃষ্টি না হলেও ফলনের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। ধানের গড় ফলন ৪.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৮: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১২ বোরো মৌসুম, উচ্চতা ১০০ সেমি, জীবনকাল ১৫৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য দানা অনেকটা ব্রি ধান ২৯ এর মতো, তবে সামান্য চিকন, ধানের গড় ফলন ৭.২ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৫৯: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১৩ বোরো মৌসুম, উচ্চতা ৮৩ সেমি, জীবনকাল ১৫৩ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি মোটা এবং সাদা, ডিগ পাতা খাড়া ও গাঢ় সবুজ এবং হেলেপড়ে না, ধানের গড় ফলন ৭.১ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৬০: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১৩ বোরো মৌসুম, উচ্চতা ৯৮ সেমি, জীবনকাল ১৫১ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল লম্বা ও সরু এবং সাদা, ধানের গড় ফলন ৭.৩ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৬১: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১৩ বোরো মৌসুম, উচ্চতা ৯৬ সেমি, জীবনকাল ১৫০ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি সরু, সাদা এবং লবণাক্ততা সহনশীল, ধানের গড় ফলন ৬.৩ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান ৬২: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১৩ আমন মৌসুম, উচ্চতা ১০২ সেমি, জীবনকাল ১০০ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল লম্বা, সরু এবং সাদা, মধ্যম মাত্রার জিংক সমৃদ্ধ এবং আগাম জাত, ধানের গড় ফলন ৩.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি হাইব্রিড ধান ১: ধারে জাত ও অবমুক্তির বছর ২০০১ মৌসুম বোরো, উচ্চতা ১১০ সেমি, জীবনকাল ১১৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা, ধানের গড় ফলন ৮.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি হাইব্রিড ধান ২: ধারে জাত ও অবমুক্তির বছর ২০০৮ মৌসুম বোরো, উচ্চতা ১০৫ সেমি, জীবনকাল ১৪৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি মোটা এবং আগাম, ধানের গড় ফলন ৮.০ টন/হেক্টর।
ব্রি হাইব্রিড ধান ৩: ধারে জাত ও অবমুক্তির বছর ২০০৯ মৌসুম বোরো, উচ্চতা ১১০ সেমি, জীবনকাল ১৪৫ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি মোটা এবং আগাম, ধানের গড় ফলন ৯.০ টন/হেক্টর।
ব্রি হাইব্রিড ধান ৪: জাত ও অবমুক্তির বছর ২০১০ মৌসুম আমন, উচ্চতা ১১২ সেমি, জীবনকাল ১১৮ দিন, জাতের বৈশিষ্ট্য চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা, ধানের গড় ফলন ৬.৫ টন/হেক্টর।

ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানের  জাতসমূহের বৈশিষ্ট্য, ১৯৭০-২০০৭

 

জীবনকাল বিভিন্ন এলাকা ও চাষের তারতম্যের জন্য সপ্তাহ খানেক কম-বেশি হতে পারে। আলো-সংবেদনশীল  জাত। এদের জীবনকাল বপন ও রোপণের সময়ের উপর নির্ভর করে। বোনা আউশ। ৪উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জন্য উপযোগী ।

মৌসুমভিত্তিক ব্রি ধানের জাতভিত্তিক চাষাবাদ পঞ্জিকা

 

বীজ বপনের তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেক জাতের নির্ধারিত চারার বয়সের দিনেই রোপণ করতে হবে এবং ফসল কাটার তারিখ থেকে মাটি ও জমি ভেদে পরবর্তী শস্যক্রম নির্ধারণ করা যায়। ব্রি ধান ২৭ অলবণাক্ত জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের জন্য উপযোগী। সরাসরি মাঠ বীজ বপনযোগ্য। *লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য উপযোগী।

ধান চাষাবাদ পদ্ধতি
উফশী ধানের ফলন উপযুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। তাই জাত নির্বাচন থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত সব কাজ ধারাবাহিকভাবে বিচক্ষণতার সাথে করতে হবে। নিয়মের হেরফের অথবা অনুমোদিত পদ্ধাত ঠিকমতো অনুসরণ না করলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং আশানুরুপ ফলন থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

জাত নির্বাচন
জমি, মৌসুম, পরিবেশ ও শস্যক্রম বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত ধানের জাত নির্বাচন করা উচিত। সে অনুযায়ী তালিকা ১ থেকে মৌসুমভেদে উপযুক্ত ধানের জাত নির্বাচন করা যেতে পারে।

বীজ বাছাই
বপনের জন্য রোগমুক্ত, পরিষ্কার, পরিপুষ্ট বীজ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভাল বীজ মানে সবল চারা। আর রোগাক্রান্ত চিটা থেকে বীজতলায় সহজেই রোগ ছড়ায়। তাই মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের লক্ষ্যে ভালভাবে বীজ বাছাইয়ের জন্য নিম্নবর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। বীজ বাছাইয়ের জন্য প্রায় ৪০ লিটার পরিষ্কার পানিতে দেড় কেজি ইউরিয়া সার মিশিয়ে দিন। এবার ৪০ কেজি বীজ ছেড়ে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দিন। ভারী, পুষ্ট, সুস্থ ও সবল বীজ ডুবে নিচে জমা হবে এবং অপরিপুষ্ট, হালকা, রোগ বা ভাঙ্গা বীজ ভেসে উঠবে। হাত অথবা চালনি দিয়ে ভাসমান বীজগুলো পৃথক করে নিন। ভারী বীজ নিচ থেকে তুলে নিয়ে পরিস্কার পানিতে ৩-৪ বার ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। ইউরিয়া মিশানো পানি সার হিসেবে বীজতলায় ব্যবহার করা যায়। কুলা দিয়ে ঝেড়ে বীজ বাছাই পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এতে চিটা দূর হলেও অপরিপুষ্ট বীজ দূরীভুত হয় না।

বীজতলা তৈরি
বীজতলা তৈরির আগে তালিকা ২ দেখে জেনে নিতে হবে কখন কোন জাতের ধানের বীজ বীজতলায় বপন করতে হবে। চারটি পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করা যায়। এগুলো হচ্ছে শুকনো, কাদাময়, ভাসমান ও দাপগ বীজতলা।
শুকনো বীজতলা- উপযুক্ত আর্দ্রতায় ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটিকে একেবারে ঝুরঝুরে করার পর জমি সমান করে শুকনো বীজতলা তৈরি করা যায়। এবার চারাগাছের পরবর্তী পরিচর্যা ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ২৫-৩০ সেন্টিমিটার চওড়া নালা তৈরি হবে। বেডের উপরি ভাগের মাটি ভালোভাবে সমান করার পর শুকনো বীজ সমানভাবে ছিটিয়ে দিন। এরপর উপরের মাটি এমনভাবে নাড়াচাড়া করতে হবে যেন বীজগুলো ২.৫-৪.০ সেন্টিমিটার (১.০-১.৫ ইঞ্চি) মাটির নিচে চলে যায়। এ কাজকে সহজ করতে ধুলা মাটির আস্তরণ দেওয়া যায়। বেডের মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিশ্চিত করার জন্য নালা ভর্তি করে সেচ দেয়া উচিত।
কাদাময় বীজতলা- দোঁআশ ও এটেল মাটি এ বীজতলায় জন্য ভাল। আরেকটি কথা, বীজতলার জমি উর্বর হওয়া প্রয়োজন। যদি জমি হয় তাহলে প্রতি বর্গমিটার জমিতে দুই কেজি হারে জৈব সার (পচা গোবর বা আবর্জনা) সুন্দরভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। এরপর জমিতে ৫-৬ সেন্টিমিটার পানি দিয়ে দু-তিনটি চাষ ও মই দিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন রেখে দিন এবং পানি ভালভাবে আটকে রাখুন। আগাছা, খড় ইত্যাদি পচে গেল আবার চাষ ও মই দিয়ে থকথকে কাদাময় করে জমি তৈরি করতে হবে। এবার জমির দৈর্ঘ্য বরাবর ১ মিটার চওড়া বেড তৈরি করতে হবে। বেডের দুই পাশের মাটি দিয়ে বেড তৈরি করা যায়।এরপর বেডের উপরের মাটি বাঁশ বা কাঠের চ্যাপ্টা লাঠি দিয়ে সমান করতে হবে। কাদা বেশি হলে বীজ মাটিতে ডুবে যাবে এবং তাতে ভালভাবে বীজ গজাবে না। এ অবস্থায় বেড তৈরির পৌনে এক ঘন্টা পর বীজ বোনা দরকার। উল্লেখ্য যে, বীজতলা তৈরির জন্য দুই বেডের মাঝে যে নালা তৈরি হলো তা খুবই প্রয়োজন। এ নালা যেমন সেচের কাজে লাগবে তেমনি প্রয়োজনে পানি নিষ্কাশন ও বীজতলার পরিচর্যা করা সহজ হয়।
ভাসমান বীজতলা- বন্যা কবলিত এলাকায় যদি বীজতলা করার মতো উঁচু জায়গা না থাকে বা বন্যাপানি নেমে যাওয়ার পর চারা তৈরির প্রযোজনীয় সময় না পাওয়া যায় তাহলে বন্যার পানি, পুকুর, ডোবা বা খালের পানির উপর বাঁশের চাটাইয়ের মাচা বা কলাগাছের ভেলা করে তার উপর ২-৩ সেন্টিমিটার পরিমাণ কাদার প্রলেপ দিয়ে ভেজা বীজতলার মতো ভাসমান বীজতলা তৈরি করা যায়। বন্যার পানিতে যেন ভেসে না যায় সেজন্য বীজতলা দড়ি বা তার দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা দরকার। পানিতে ভাসমান থাকার জন্য এ বীজতলার পানি সেচের দরকার হয় না।
দাপগ বীজতলা- বন্যা কবলিত এলাকার জন্য ডাপোগ বীজতলা করা যায়। বাড়ীর উঠান, পাকা বারান্দা বা যে কোন শুকনো জায়গায় চারদিকে মাটি, কাঠ, ইট বা কলাগাছের বাকল দিয়ে চৌকোণা করে নিতে হবে। এবার কলাপাতা বা পলিথিন বিছিয়ে তার উপর ঘন করে অঙ্কুরিত বীজ বুনতে হবে। এ বীজতলার নিচে আচ্ছাদন থাকায় চারাগাছ মাটি থেকে কোনররূপ খাদ্য বা পানি পায় না বলে ৫-৬ ঘন্টা পর পর ভিজিয়ে দিতে হবে এবং দু’সপ্তাহের মধ্যেই চারা তুলে নিয়ে রোপণ করা দরকার। অন্যথায় চারাগাছ খাদ্যের অভাবে মারা যেতে পারে।

বীজ জাগ দেওয়া
উপরে বর্ণিত বীজ বাছাই পদ্ধতিতে বাছাইকৃত বীজ কাপড় বা চটের ব্যাগে ভরে ঢিলা করে বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে রাখুন ২৪ ঘন্টা। এরপর বীজের পোটলা পানি থেকে তুলে ইট বা কাঠের উপর ঘন্টাখানেক রেখে দিন পানি ঝড়ে যাওয়ার জন্য। এবার বাঁশের টুকরি বা ড্রামে ২/৩ পরত শুকনো খড় বিছিয়ে তার উপর বীজের পোটলা রাখুন এবং আবারও ৩/৪ পরত শুকনো খড় দিয়ে ভালভাবে চেপে তার উপর ইট বা কাঠ অথবা যেকোন ভারি জিনিস দিয়ে চাপা দিন। এভাবে জাগ দিলে ৪৮ ঘন্টা বা ২ দিনেই ভাল বীজের অঙ্কুর বের এবং কাদাময় বীজতলায় বপনের উপযুক্ত হবে।

বীজতলায় বপন
সতেজ ও সবল চারা আমাদের প্রধান কাম্য। তাই বাছাইকৃত বীজ ওজন করে নিতে হবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলায় ৮০-১০০ গ্রাম বীজ বোনা দরকার। এরূপ ১ বর্গমিটার বীজতলার চারা দিয়ে ২৫-৩০বর্গমিটার জমি রোপণ করা যাবে। উল্লেখ্য যে, ডাপোগ বীজতলার জন্য প্রতি বর্গমিটারে ২.৫-৩.০ কেজি বীজ বুনতে হবে এবং শুকনো বীজতলার জন্য বীজ জাগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভেজা বীজতলায় বীজ বেডের উপর থাকে বলে পাখিদের নজরে পড়ে। তাই বপনের সময় থেকে ৪/৫ দিন পর্যন্ত পাহারা দিতে হবে। তালিকা ২ এ জাত ভিত্তিক বীজ বপনের সময় উল্লেখ করা হয়েছে।

বীজতলার পরিচর্যা
বীজতলায় সব সময় নালা ভর্তি পানি রাখা দরকার। বীজ গজানোর ৫-৬ দিন পর বেডের উপর ২-৩ সেন্টিমিটার পানি রাখলে আগাছা ও পাখির আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বোরো মৌসুমে শীতের জন্য চারার বাড়-বাড়তি ব্যহত হয়। এ কারণে রাতে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখলে ঠান্ডাজনিত ক্ষতি থেকে চারা রক্ষা পায় এবং চারার বাড় বাড়তি বৃদ্ধি পায়। বীজতলায় আগাছা, পোকামাকড় ও রোগবালাই দেখা দিলে তা দমন করার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজতলায় চারাগাছ হলদে হয়ে গেলে প্রতি বর্গমিটারে ৭ গ্রাম করে ইউরিয়া সার উপরি-প্রযোগ করলেই চলে। ইউরিয়া প্রয়োগের পর চারা সবুজ না হলে গন্ধকের অভাব হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। তখন প্রতি বর্গমিটারে ১০ গ্রাম করে জিপসাম সার উপরি-প্রয়োগ করা দরকার। ইউরিয়া সারের উপরি-প্রয়োগের পর বীজতলার পানি নিষ্কাশন করা উচিত নয়।  

চারা উঠানো
চারা উঠানোর আগে বীজতলায় বেশি করে পানি দিতে হবে যাতে বেডের মাটি ভিজে একেবারে নরম হয়ে যায়। চারা উঠাতে এমন সাবধানতা নিতে হবে যেন চারা গাছের কান্ড মুচড়ে বা ভেঙ্গে না যায়। উঠানো চারার মাটি কাঠ বা হাতে আছাড় না দিয়ে আস্তে আস্তে পানিতে নাড়াচাড়া দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, চারাগাছের শিকড় ছিঁড়ে গেলেও রোপণের পর চারার বাড়-বাড়তির কোনররূপ অসুবিধা হয় না কিন্তু কান্ড মুচড়ে গেলে চারাগাছের বেশ ক্ষতি হয়। এ জন্য চারা উঠানোর পর ঐ চারার পাতা দিয়ে বান্ডিল বাঁধাও উচিত নয়। শুকনো খড় ভিজিয়ে নিয়ে বান্ডিল বাঁধতে হবে।

চারা বহন
বীজতলা থেকে রোপণ ক্ষেতে চারা বহন করার সময় পাতা ও কান্ড মোড়ানো রোধ করতে হবে। এজন্য ঝুড়ি বা টুকরিতে এক সারি করে সাজিয়ে ভারের সাহায্যে চারা বহন করা উচিত। বস্তাবন্দী করে ধানের চারা বহন করা উচিত নয়।

রোপণের জন্য জমি তৈরি
জমিতে হেক্টরপ্রতি ৩-৫ টন পরিমাণ জৈব সার ভালভাবে ছিটিয়ে দিন। এখন ৫-১০ সেন্টিমিটার পানি দিয়ে দুটি চাষ আড়াআড়িভাবে দিয়ে ৭-৮ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এবার ১০-১৫ সেন্টিমিটার গভীর করে আড়াআড়িভাবে দুটি চাষ ও দুটি মই দিয়ে ৩-৪ দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপর দিতে হবে শেষ চাষ। এ চাষের আগেই নাইট্রোজেন (১ম কিস্তি), পটাশ, ফসফেট এবং জিপসাম সার ছিটিয়ে চাষ শুরু করতে হবে। সারের পরিমাণ সার ব্যবস্থাপনা অংশ থেকে দেখে নিতে হবে। জমির মাটি ভেদে শেষ চাষ এক বা দুবার হতে পারে। মই দিতে হবে ২-৩ বার জমি সমান হয় এবং সমস্ত জমিতে কই গভীরতায় পানি থাক্ েউওমরূপে কাদা করে তৈরি জমিতে পানির অপচয় কম হয়, নাইট্রোজেন সারের কার্যকারিতা বাড়ে, অনেক আগাছা দমন হয় এবং অতি সহজে  চারা রোপণ করা যায়।

চারা রোপণ
চারার বয়স- ভাল ফলন পেতে হলে উপযুক্ত বয়সের চারা রোপণ করা জরুরি। তালিকা ২ তে জাত ও মৌসুম ভেদে চারার বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণভাবে আউশে ২০-২৫ দিন, রোপা আমনে ২৫-৩০ দিন এবং বোরাতে ৩৫-৪৫ দিন হওয়া উচিত।
রোপণের নিয়ম- রোপণের সময় জমিতে ছিপছিপে পনি থাকলে চলে। প্রতি গুছিতে ২-৩ টি চারা রোপণ করা ভাল। মাটির ২-৩ সেন্টিমিটার গভীরতায় চারা রোপণ করা উত্তম। সঠিক গভীরতায় চারা রোপণ করলে চারার বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং কুশির সংখ্যা বেশি হয়।
চারা রোপণের দূরত্ব- সারিবদ্ধ ভাবে চারা রোপণ করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব এবং প্রতি সারিতে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব বজায় রাখতে হবে (তালিকা ২)। এ বিষয়টি অতীত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক গুছি থাকলে নির্দিষ্ট ফলন হবে। আবার সারিবদ্ধ চারা রোপণ করলে নিড়ানি যন্ত্র ব্যবহার করা যায় তাতে খরচ কমবে। গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে চারার দূরত্ব সঠিক হতে হবে। উপরন্তু সঠিক দূরত্ব চারা রোপণ হলে প্রত্যেক গাছ সমানভাবে আলো, বাতাস ও সার গ্রহণের সুবিধা পাবে আর তা ভাল ফলনে সহায়তা দেবে।
বিকল্প চারা- বন্যা কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক কারণে ফসল নষ্ট হলে যেসব জায়গায় ধান নষ্ট হয়নি সেখান থেকে কুশি ভেঙ্গে নিয়ে অন্যত্র রোপণ করা যায়। এতে ফসলের কোন ঘাটতি দেখা যায় না। প্রতিটি গোছা থেকে ২-৩ টি কুশি রেখে বাকিগুলো আলাদা করে অন্য জায়গায় প্রতি গোছায় দুটি করে রোপণ করলেও ভাল ফলন পাওয়া যায়।

সার ব্যবস্থাপনা
রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনা- সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার ফসল, মাটি এবং পরিবেশের জন্য ভাল। এজন্য প্রথমে জানতে হবে কৃষি পরিবেশ অঞ্চল ভিত্তিক মাটির উর্বরতা শ্রেণী (তালিকা ৩) এবং এবার জেনে নিতে হবে জমি কোন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। কৃষি পরিবেশ অঞ্চল অনুযায়ী তালিকা ৪ এ মৌসুম ভিত্তিক সারের মাত্রায় সুপারিশ দেওয়া আছে।
পটাশ, ফসফেট, জিপসাম ও দস্তা সারের প্রভাব পরবর্তী ফসল পর্যন্ত থাকে। এ জন্য রবি ফসলে ফসফেট, পটাশ ও জিপসাম সার তালিকা ৪ মোতাবেক ব্যবহার করলে দ্বিতীয় ফসলে উল্লিখিত সারগুলোর মাত্র অর্ধেক পরিমাণ ব্যবহার করতে হবে। দস্তা সার একবার প্রয়োগ করলে তা পরের তিন ফসলে প্রয়োগ করতে হবে না। তালিকা ৫ এ জাত ও মৌসুম ভিত্তিক ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের সময় ও কিস্তি উল্লেখ করা হয়েছে।
নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা জমিতে কম সময় থাকে তাই এ সার কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তি জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে, ২য় কিস্তি ধানের গোছায় ৪-৫ টি কুশি অবস্থায় ও ৩ য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে দিতে হবে। যে সব জাতের জীবনকাল ১৫০ দিনের বেশি সেক্ষেত্রে জমি তৈরির সময় ইউরিয়া প্রথম কিস্তি এবং পরে সমান তিন কিস্তিতে উপরি-প্রয়োগ করতে হবে।
ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের সময় মাটিতে অব্যশই প্রচুর রস থাকতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি ক্ষেতে ২-৩ সেন্টিমিটার পানি থাকে। ইউরিয়া প্রয়োগের সাথে সাথে হাতে বা উইডার দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করা দরকার। তাহলে সার যেমন মাটিতে মিশে যায় তেমনি আগাছা না থাকায় সব সার ধান গাছ পেয়ে যায়।
ইউরিয়া সার প্রয়োগের পরেও যদি ধানগাছ হলদে থাকে এবং বাড় বাড়তি কম হয় তাহলে সালফার বা গন্ধকের অভাব রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ হিসেবে জমি থেকে পানি সরিয়ে নিতে হবে। এরপর হেক্টরপ্রতি ৬০ কেজি বা বিঘা প্রতি ৮ কেজি জিপসাম সার উপরি প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। তবে উপরি-প্রযোগের সময় জিপসাম সার মাটি কিংবা ছাইয়ের সাথে অথবা ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের সময়উরিয়া সারের সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করা ভাল।
যদি ধানগাছ মাঝে মধ্যে খাটো হয় বা বসে যায় এবং পুরাতন পাতায় মরচে পড়া বাদামি থেকে কমলা রঙ ধারন করে এবং ধানের কুশি কম থাকে তখন ধরে নিতে হবে দস্তার অভাব হযেছে। এ ক্ষেত্রে জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। তারপর হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি বা বিঘা প্রতি ১ কেজি ৩৫০ গ্রাম দস্তা সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

ফলন মাত্রা, মৌসুম ও মাটির উর্বরতা ভিত্তিক সার প্রদানের সুপারিশ

 

ধানের বিভিন্ন জাত ও মৌসুম অনুসারে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের সময়

 

*চারার বয়স কম-বেশি হলে ১ম ও২য় কিস্তির উপরি প্রয়োগের সময়ও কম বেশি হবে।

অন্যথায় হেক্টরপ্রতি ২.৫-৩.০ কেজি দস্তা সার (জিঙ্ক সালফেট) ১২৫-১৫০ গ্যালন পরিষ্কার পানির সাথে মিশিয়ে  স্প্রে মেশিনের সাহায্যে দু’কিস্তিতে যথাক্রমে রোপণের ১০-১৫ ও ৩০-৩৫ দিন পর ধানগাছের পাতার উপর ছিটিয়ে দিলে ভাল ফল পাওয়া যায়। এভাবে মূল্যবান দস্তা সারের অপচয় রোধ করা সম্ভব।

লিফ কালার চার্ট ব্যবহার করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ
লিফ কালার চার্ট (এলসিসি) প্লাস্টিকের তৈরি চার কোঠাবিশিষ্ট একটি সবুজ রঙের স্কেল। এলসিসি’র সাথে ধান গাছের পাতার রঙ মিলিয়ে সঠিক সময়ে ও সঠিক পরিমাণে ইউরিয়া প্রয়োগ করা যায়। ফলে ইউরিয়া সারের খরচ কমানো ও অপচয় রোধ করা যায় এবং সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

এলসিসি ব্যবহারের নিয়ম- ধান গাছের সবচেয়ে উপরের পুরোপুরি বের হওয়া কচি পাতার মাঝামাঝি অংশ এলসিসি’র প্রতিটি কোঠার উপর স্থাপন করে এলসিসি’র সাথে পাতার রঙের গাঢ়ত্ব তুলনা করতে হবে। পাতার রঙ এলসিসি’র যে কোঠার নম্বরের সাথে মিলে যাবে তার মানই হবে পাতার এলসিসি মান। যদি পাতার রঙ এলসিসি’র পাশাপাশি দুটি রঙের মাঝামাঝি হয়, তাহলে উক্ত দুটি নম্বরের গড় মানই হবে পাতার এলসিসি মান। রোপা ধানের জন্য এলসিসি’র ক্রিটিক্যাল (সংকট) মান ৩.৫ এবং বোনা ধানের জন্য ৩.০। এলসিসি ব্যবহারের নিয়ম তালিকা ৭-এ দেখানো হয়েছে।

সতর্কতা- এলসিসি ব্যবহারে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এগুলো হচ্ছে -

  • শুধু ইউরিয়া প্রয়োগের ক্ষেত্রেই এলসিসি ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য সার অব্যশই সুষম মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।
  • ধানগাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে এলসিসি’র মান নির্ণয় করা যাবে না।
  • নির্বাচিত পাতাটি রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ মুক্ত হতে হবে।
  • পাতার রঙ পরিমাপের সময় সূর্যের আলো এলসিসি’র উপর পড়লে মাপ সঠিক হবে না। শরীরের ছায়ায় রেখে এলসিসি দিয়ে ধানগাছের পাতার রঙ মাপতে হবে।
  • সকাল ৯-১১ টা বা বিকাল ২-৪ টার মধ্যে এলসিসি দিয়ে পাতার রঙ মাপা ভালো।

ধান ক্ষেতে ইউরিয়া সার উপরি-প্রয়োগে এলসিসি ব্যবহারের নিয়মাবলী

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য- মাপ নেয়ার তারিখে সার দেয়ার প্রয়োজন না হলে ১০ দিনের পরিবর্তে ৫ দিন পর মেপে প্রয়োজনে সার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সার প্রয়োগের দিন থেকে ১০ দিন পর আবার এলসিসি দিয়ে একইভাবে মাপ নিতে হবে।

ধানে চাষে গুটি ইউরিয়া
বাজারে প্রাপ্ত সাধারণ ইউরিয়া সার দিয়ে ব্রিকেট মেশিনের সাহায্যে তৈরি বড় আকারের ইউরিয়া সারের গুটিকে ‘গুটি ইউরিয়া বলে’। এই গুটি ইউরিয়া দেখতে অনেকটা ন্যাপথালিন ট্যাবলেটের মতো। বর্তমানে বাজারে সাধারণত তিন সাইজের গুটি ইউরিয়া পাওয়া যায়। এগুলো হলো ছোট সাইজ (০.৯০ গ্রাম), মধ্যম সাইজ (১.৮ গ্রাম) এবং বড় সাইজ (২.৭০ গ্রাম)।
আমাদের দেশে সাধারণত ইউরিয়া সার ছিটিয়ে জমিতে প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতিতে প্রয়োগকৃত সারের শতকরা মাত্র ২৫-৩০ ভাগ গাছ গ্রহণ করতে পারে আর বাদবাকি ৭০-৭৫ ভাগই গাছের কাজে আসে না। কারণ ইউরিয়া সার শতকরা ৬০-৭০ ভাগ ভোলাটিলাইজেশন পদ্ধতিতে এমোনিয়া গ্যাস, নাইট্রিফিকেশন, ডি-নাইট্রিফিকেশন এবং নাইট্রোজেন ও নাইট্রাস অক্রাইড গ্যাস হিসেবে উড়ে যায়। আবার নাইট্রেট হিসেবে চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে মিশে যায়। কিন্তু গুটি ইউরিয়া থেকে উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে অপচয় অনেকাংশে রোধ হয়ে থাকে। এ জন্য গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে নাইট্রোজেন সারের কার্যকারিতা শতকরা ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পায় এবং ইউরিয়া সার কম লাগে। গুটি ইউরিয়া জমিতে একবার প্রয়োগই যথেষ্ট, ফলে বার বার প্রয়োগের ঝামেলা থাকে না। প্রয়োগের পর সব সময় গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন সরবরাহ থাকায় গাছের কোন সুপ্ত ক্ষুধা থাকে না। ফলে ধানের ফলনও ১৫-২০ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের জন্য ধানের চারা সারি করে লাগাতে হবে। সারি থেকে সারির এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব হবে ৮ ইঞ্চি (২০ সেন্টিমিটার)। ধানের চারা লাগানোর ৭-১০ দিনের মধ্যে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে এ সময় জমিতে যেন পরিমাণ মতো (১ ইঞ্চি) পানি থাকে। প্রতি চার গোছার মাঝখানে ৩-৪ ইঞ্চি কাদার গভীর গুটি পুঁতে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন গুটি প্রয়োগকৃত স্থানে ‘পা’ না পড়ে। ড্রাম সিডার অথবা বপন পদ্ধতিতে চাষ করা হলে প্রতি ১৫ দূরত্বে গুটি প্রয়োগ করতে হবে। গুটি প্রয়োগের পর জমিতে সব সময় প্রয়োজনীয় পানি রাখতে হবে যেন জমি শুকিয়ে না যায়।

নাইট্রোজেনের মাত্রা দাঁড়ায় হেক্টরে ২৫ কেজি , অনুরূপভাবে মধ্যম সাইজের গুটি প্রয়োগে হেক্টরে ৫০ কেজি এবং বড় সাইজের গুটি প্রয়োগে হেক্টরে ৭৫ কেজি। সাধারণত: আউশ ও আমন ধানের জন্য ০.৯০ গ্রাম সাইজের দুটি অথবা ১.৮ গ্রাম সাইজের একটি গুটি প্রতি চার গোছার মাঝে প্রয়োগ করতে হবে। বোরো ধানের জন্য ০.৯০ গ্রাম সাইজের তিনটি (২.৭ গ্রাম) অথবা মধ্যম সাইজের একটি এবং ছোট সাইজের একটি মোট দুটি (২.৭ গ্রাম) অথবা বড় সাইজের (২.৭গ্রাম) একটি গুটি ইউরিয়া প্রয়োজন। বিশেষ ক্ষেত্রে, যেমন মাটির উর্বরতা শক্তি খুবই কম হলে অথবা ড্রাম সিডার দ্বারা কিংবা বপন পদ্ধতিতে চাষ করা হলে অথবা বোরো মৌসুমে দীর্ঘ মেয়াদি (১৫০-১৭০ দিন) জাতের ধান রোপণ করা হলে কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে অতিরিক্ত শতকরা ১৫-২০ ভাগ নাইট্রোজেন সার উপরি প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে সুফল পেতে হলে কাদা মাটিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। যেসব জমিতে পানি চুয়ানোর মাত্রা (চবৎপড়ষধঃরড়হ ৎধঃব) বেশি, অর্থাৎ বেলে বা বেলে-দোঁয়াশ মাটিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা উচিত নয়। অনুমানের ভিত্তিতে সার প্রয়োগ করা ঠিক নয়। মাটি পরীক্ষা করে সুপারিশকৃত মাত্রায় সার ব্যবহার করা উচিত।

জৈব সার ব্যবস্থাপনা- মাটির উর্বরতা শক্তির চালক হিসেবে গণ্য হয় জৈব সার। তাই জৈব বা সবুজ সার (পচা গোবর, আর্বজনা, কম্পোস্ট, ধৈঞ্চা ইত্যাদি) জমিতে বছরে একবার হলেও প্রয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন। ফসল চক্রের প্রথম (খরিফ খন্দে) যে জমিতে জৈব সার ব্যবহার করা হবে সে জমিতে পরবর্তী ধান ফসলে ইউরিয়া সার মাত্রার এক তৃতীয়াংশ কম ব্যবহার করতে হবে। সবুজ সার ধান রোপণের ৭-১০ দিন আগে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

আগাছা দমন
আগাছা ধানগাছের সাথে আলো, পানি ও খাদ্য উপাদানের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। আগাছা প্রতিকূল পরিবেশ সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং ধানগাছের চেয়ে অধিক হারে বাড়তে পারে। এ জন্য ধানের চেয়ে আগাছার বৃদ্ধি অনেক বেশী হয়। ফলে ধান গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পরিমানে ফলন অনেক কম হয়। তাছাড়া আগাছা পোকা মাকড় ও রোগবালাইয়ের হিসেবে কাজ করে পরোক্ষভাবে ধানের ক্ষতি করে থাকে। সাধারণত আমন ও বোরো মৌসুমের চেয়ে আউশ মৌসুমে, বিশেষ করে বোনা আউশে আগাছার উপদ্রব বেশী হয়। আউশ মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিপাতের পর জমিতে দু’ একটি চাষ ও মই দিয়ে ধানের বীজ বপন করলে আগাছার উপদ্রব অনেকাংশে কমে যায়। রোপা ধানের জমিতে ৫-১০ সেন্টিমিটার পানি রাখলে জমিতে আগাছা কম জন্মায়।

বিভিন্ন ধানের জাত ও মৌসুমভেদে আগাছার সাথে ধানগাছের প্রতিযোগিতার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। সাধারনত ধানগাছ যতদিন মাঠে থাকে (রোপণের পর থেকে ধান পাকা পর্যন্ত) তার তিন ভাগের প্রথম এক ভাগ সময় আগাছা মাক্ত রাখলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়। আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য ৩০-৪০ দিন এবং বোরো মৌসুমের জন্য ৪৭-৫০ দিন জমি আগাছামুক্ত রাখা উচিত। কারণ এ সময় আগাছা দমন না করতে পারলে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় পরে সারা মৌসুমেও ঐ জমি আগাছামুক্ত রেখে তা পূরণ করা যায় না।

যান্ত্রিক আগাছা দমন পদ্ধতি- হাত দিয়ে, নিড়ানি যন্ত্রের সাহায্যে, আগাছানাশক ব্যবহার করে এবং জৈবিক পদ্ধতিতে আগাছা দমন করা যায়। হাত দিয়ে আগাছা দমন অপেক্ষাকৃত সহজ। রোপা ধানে কমপক্ষে দুবার আগাছা দমন করতে হয়। প্রথমবার ধান লাগানোর ১৫ দিন পর এবং পরের বার ৩০-৩৫ দিন পর। জমিতে পানির পরিমাণ ১০-১৫ সেন্টিমিটার রাখতে পারলে দুবার হাত নিড়ানি প্রয়োজন পড়ে। এ পদ্ধতিতে আগাছা দমনে শ্রমিক ,সময় ও খরচ বেশি লাগে।

নিড়ানি যন্ত্র ব্যবহার দু’সারির মাঝের আগাছা নির্মূল হয়। কিন্তু দু’গুছির ফাঁকে যে ঘাস থাকে তা হাত দিয়ে তুলতে হবে। উঠানোর পর আগাছা মাটির ভিতর পুঁতে দিলে তা পচে গিয়ে জৈব সারের কাজ করবে। ব্রি উইডার নামের নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে ঘন্টায় ১০ শতাংশ জমির আগাছা নির্মূল করা যায়। এটি ব্যবহার করা সহজ ও ওজনে হালকা, ফলে মহিলা শ্রমিকরাও সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারে।

আগাছানাশক ব্যবহার- আগাছানাশক ব্যবহার করে সহজেই আগাছা দমন করা যায়। এ পদ্ধতি অধিকতর কার্যকর ও সাশ্রয়ী হওযায় আগাছানাশকের ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আগাছানাশক ব্যবহার কম সময়ে কম খরচে বেশি পরিমাণ জমির আগাছা দমন করা যায়। এর মধ্যে তরল ও পাউডার জাতীয় এ তিন ধরনের আগাছানাশক বাজারে পাওয়া যায়। এর মধ্যে তরল ও পাউডার জাতীয় আগাছানাশক নির্দিষ্ট পরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে স্প্রে মেশিন দিয়ে ছিটাতে হয় এবং দানাদার আগাছানাশক সারের মতো জমিতে ছিটিয়ে ব্যবহার করা যায়। প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক ধান লাগানোর ৩-৬ দিনের মধ্যে এবং পোস্ট-ইমারজেন্স আগাছানাশক আগাছার বৃদ্ধি ও তাপমাত্রাভেদে রোপণ/বপনের ১০-২৫ দিনের মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। কিছু অনুমোদিত আগাছানাশক এবং তার ব্যবহার তালিকা ৬-এ দেয়া হলো।

জমিতে ১-৩ সেন্টিমিটার পানি থাকা অবস্থায় প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক প্রয়োগ করতে হয়। পোস্ট-ইমারজেন্স আগাছানাশক জমিতে আগাছার বৃদ্ধি ১-২ পাতাবিশিষ্ট হলেই ব্যবহার করা যায়। আগাছানাশক প্রয়োগকৃত জমিতে ৩০ দিন পর আর একবার হালকা হাত নিড়ানির প্রয়োজন হতে পারে।

জৈবিক আগাছা দমন পদ্ধতি- আগাছা খেকো জীব, পোকামাকড়, ছত্রাক ও পরজীবীর মাধ্যমে পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে আগাছা দমন করাই হচ্ছে জৈবিক আগাছা দমন। সমন্বিত ধান হাঁস এমনই এক জৈবিক আগাছা দমন পদ্ধতি।

  • ধান হাঁস চাষ পদ্ধতিতে জমি তৈরির সময় বিঘাপ্রতি ২০-২৫ মণ গোবর সার মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। ধানের চারা রোপণের ৭-১৪ দিন পর ২০-৩০ দিন বয়সের হাঁসের বাচ্চা সারি করে লাগানো ধান ক্ষেতে অবমুক্ত করতে হয় এবং ধানে ফুল আসার আগে হাঁস ধান ক্ষেত থেকে উঠিয়ে নিতে হয়।
  • হাঁসের বাচ্চা যাতে অন্যত্র না চলে যায় বা এদের সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হলে ক্ষেতের চারদিকে জাল দিয়ে বেড়া দিলে ভাল হয়।
  • হিসাব করে দেখা গেছে, এ পদ্ধতিতে প্রতি বিঘা ৪০-৫০ টি হাঁসের বাচ্চার প্রয়োজন।
  • হাঁস কার্যকরভাবে ধানের আগাছা খেয়ে সম্পূর্ণভাবে তা ধ্বংস করে এবং কীটপতঙ্গ খেয়ে তাদেরকে দমন করে। হাঁসের বিষ্ঠা জমিতে জৈব সারের কাজ করে।
  • এ পদ্ধতি অনুসরণ করে কৃষক একই সাথে ধান, হাঁস ও ডিম উৎপাদন করতে পারে।
  •  
  •  
  • অনুমোদিত আগাছানাশক এবং তার প্রয়োগ পদ্ধতি
  •  
  •  

সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা- একাধিক আগাছা দমন পদ্ধতির সমন্বয়ে পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিুে রেখে আগাছা ব্যবস্থাপনার নাম সমন্বিত আগাছা দমন। শুধু হাত দিয়ে বা নিড়ানি যন্ত্র অথবা আগাছানাশক দিয়ে আগাছা দমনের চেয়ে বেশি কার্যকর উপযুক্ত সমন্বিত পদ্ধতি। সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনার উল্লেখযোগ্য কিছু দিক হলো-

  • আগাছামুক্ত পরিষ্কার বীজ ব্যবহার করলে আগাছার পরিমাণ কম হবে।
  • জমি ভালভাবে প্রস্তুত করলে আগাছার পরিমাণ কম হবে।
  • জমিতে অনেক সময় আগাছানাশক ছিটানোর পরও কিছু আগাছা দেখা যায়। এগুলো হাত নিড়ানি দিয়ে জমি থেকে তুলে ফেলা উচিত।
  • উইডার দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি রাখলে আগাছার পরিমাণ কম হয়।

সেচ ব্যবস্থাপনা
চারা রোপণের পর জমিতে পানি কম রাখতে হবে যাতে চারা তলিয়ে না যায়। ধানের জমিতে সব সময় গভীর পানি ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে একটি পূর্ণমাত্রায় সেচ দেওয়ার পর পরবর্তী সেচ দেওয়ার আগে জমি তিন দিন শুকনো রাখলে ধানের ফলন তেমন কমবে না উপরন্তু পানির পরিমাণ ২৫-৩০ ভাগ কম লাগবে। গভীর নলকূপ এলাকায় এই পদ্ধতিতে একই পরিমাণ পানি দিয়ে প্রায় অতিরিক্ত ৪০ ভাগ জমিতে সেচ দেয়া যায়। এ পদ্ধতিতে আগাছার পরিমাণ বেশি হলে আগাছানাশক প্রয়োগ করা লাভজনক। ধানগাছে কাইচথোড় আসার আগ পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে পানি সেচ দেওয়া যায়। তবে কাইচথোড় আসা শুরু করলে ৫-৭ সেন্টিমিটার পানি থাকলে ভাল হয়। এছাড়াও আমন ধান কাটার পর জমি পতিত না রেখে একটা বা দুটো চাষ দিয়ে ফেলে রাখলে বোরো মৌসুমে জমি তৈরিতে শতকরা ২০ ভাগ পানি কম লাগবে। কারণ পতিত জমিতে ফাটল ধরলে জমি তৈরির সময় ফাটল দিয়ে প্রচুর পানির অপচয় হয়।

সার প্রয়োগের আগে জমি থেকে পানি কমিয়ে উপরি প্রয়োগ করতে হয় এবং ২-৩ দিন পর আবার পানি দিলে সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। জমিতে পানি ধরে রাখলে দানাদার কীটনাশক ওষুধের গুনাগুণ বাড়ে। ধান পাকার সময় দানা শক্ত হওয়া শুরু হলেই জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হয়। আউশ ও আমন মৌসুমে বৃষ্টির পানির সাহায্যে ভালভাবেই উফশী ধানের চাষ করা যায়। বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে চাষ করতে হলে ক্ষেতে পানি ধরে রাখার জন্য আইল ১৫ সেন্টিমিটার উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে।

সেচের পানির অপচয় রোধ- জমির পাশ কাটিয়ে মাটির নালা দিয়ে পাম্প থেকে পানি সেচ দেওয়া প্রচলিত আছে। তাতে জমি ও পানির অপচয় হয়ে থাকে। এ অপচয়  রোধকল্পে পিভিসি অথবা প্লাস্টিক পাইপ ব্যবহার করা যায়। এ পদ্ধতিতে সেচ দিলে পানির অপচয় বন্ধের সাথে সাথে সেচ খরচও কমানো যায় কারণ এ ব্যবস্থায় গভীর নলকূপ থেকে কাঁচা নালার সেচের তুলনায় শতকরা ৪২ ভাগ বেশি জমিতে পানি সেচ দেওয়া সম্ভব। তাছাড়া অঙ্কুরিত বোনা ধানের চাষ করে পানির কার্যক্ষমতা শতকরা ২৯ ভাগ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
সম্পূরক সেচ- বৃষ্টিনির্ভর ধান চাষে খরা মোকাবেলা করার জন্য সম্পূরক সেচ দিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, দু’বারে ১৫২ মিলিমিটার সম্পূরক সেচ দিয়ে শতকরা ৪০-৫০ ভাগ ধানের ফলন বাড়ানো যায়। বৃষ্টিনির্ভর খরা কবলিত ধানের চেয়ে সম্পূরক সেচযুক্ত ধানের ফলন হেক্টরে প্রায় ১ টন বেশি হয়। অগভীর (স্যালো) কিংবা গভীর নলকূপ (ডিপ টিউবওয়েল) ছাড়াও পুকুর পদ্ধতিতে খরা মোকাবিলা করা যায়। এ জন্য ধানি জমির আয়তনের শতকরা ৫ ভাগ জায়গায় ২ মিটার গভীর করে পুকুর কেটে নিতে হবে। এ ছোট পুকুরে যে পরিমাণ বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যাবে তা দিয়ে খরার সময় রোপা আমন ধানকে রক্ষা করা যায়। উপরন্তু ছোট পুকুরে মাছ চাষও করা যায়।

সংগৃহীত ও সংকলিত

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প