ধানের রোগবালাই দমনে করণীয়

পাতাপোড়া রোগ/বিএলবি রোগ:

লক্ষণ: পাতা পোড়া রোগ চারা এবং বয়স্ক গাছে তিন ধরনের লক্ষণ সৃষ্টি করে। লক্ষণগুলি নিম্নরূপ:-

ক.  কৃসেক-চারা ও কুশি অবস্থায় সাধারনত: কৃসেক লক্ষণ প্রকাশ পায়। এ রোগের কারনে গাছটি প্রথমে নেতিয়ে পড়ে ও আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ গাছটি মারা যায়। আক্রান্ত গাছের কান্ড ছিড়ে চাপ দিলে বা চারাটি গোড়ার দিকে ভেঙ্গে দু’আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে পুঁজের মত খুব দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থ বের হয়।

খ.  ফ্যাকাশে হলুদ পাতা-আক্রান্ত গাছের কচি পাতা ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে অবশেষে শুকিয়ে মারা যায়। সাধারণত: দিবা রাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্য ৮-১০ ডিগ্রি সেঃ এর বেশী হলে এ লক্ষণ দেখা যায়।

গ.  পাতাপোড়া- ধান গাছের কুশি বা তার পরবর্তী পর্যায়ের যে কোন সময়ে পাতাপোড়া লক্ষণ দেখা যায়। প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে পাতার যে কোন স্থানে বা বিশেষ করে অগ্রভাগে বা কিনারায় নীলাভ পানিচোষা দাগ দেখা যায়। দাগগুলো আস্তে আস্তে হালকা হলুদ রং ধারন করে। এ রোগের কারনে শীষ বের হতে পারে না বা বের হলেও চিটা বা আংশিক অপুষ্ট হয় এবং ফলনের অনেক ক্ষতি হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • বীজতলা থেকে চারা উঠানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে শিকড় যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।

  • রোগ প্রতিরোধী জাতের ব্যবহার পাড়াপোড়া রোগকে অনেকগুনে কমিয়ে রাখে। সে লক্ষ্যে আমন মৌসুমে ব্রি ধান-৪০, ব্রি ধান-৪১ এর চাষ করা।

  • সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার ও ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করা।

  • ধান কাটার পর জমিতে নাড়া ও খড় পুড়িয়ে ফেলা যাতে করে পরবর্তী ফসলে আর এ রোগ দেখা দিতে না পারে।

  • ঝড় ও অত্যাধিক বৃষ্টির পর ইউরিয়া সার না দেয়া, রোগ দেখার পর ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ বন্ধ করা।

  • পাতাপোড়া বা কৃসেক লক্ষণ দেখা দিলে জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার পানি দেয়া।

  • বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার ছিপছিপে পানিতে প্রয়োগ করে মাটিতে ভালভাবে মিশিয়ে দিলে এ রোগের তীব্রতা কমে।

খোলপঁচা রোগ:

রোগের লক্ষণ: প্রথমে ডিগ পাতার খোলে ছোট ছোট বাদামী আকারের দাগ পড়ে। দাগলো আস্তে আস্তে বেড়ে একত্রে মিশে সম্পূর্ণ খোলে ছড়িয়ে পড়ে। রোগের আক্রমণ বেশী হলে আক্রান্ত কুশির শীষ বের হতে পারে না। অনেক সময় শীষ অর্ধেক বের হয় এবং ধান কালো ও চিটা হয়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • জমিতে পরিমিত ইউরিয়া সার ব্যবহার করা।

  • জমির পানি শুকিয়ে আবার পানি দেওয়া।

  • আক্রমন বেশি হলে নেটিভো অথবা ফলিকুর অথবা কনটাফ ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।

খোলপোড়া রোগ:

লক্ষণ: প্রথমে খোলে হাল্কা বাদামী রঙের জলছাপের মতো দাগ পড়ে।আস্তে আস্তে সমস্ত খোলে ও পাতায় অনেকটা গোখরা সাপের চামড়ার মতো চক্কর দেখা যায়।বেশি ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে ও গরম এবং ভেজা আবহাওয়ায় এটি বেশি হয়।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা।

  • ঘন করে চারা না লাগানো।

  • আক্রান্ত জমির পানি শুকিয়ে আবার পানি দেওয়া।

  • আক্রমন বেশি হলে টেবুকোনাজল (যেমন- ফলিকুর প্রতি একরে ২০০ মিলি হারে) অথবা হেক্সাকোনাজল (যেমন- কনটাফ ৫ তরল প্রতি একরে ২০০ মিলি হারে) অথবা কারবেনডাজিম (যেমন বাভিস্টিন প্রতি একরে ২০০ গ্রাম হারে) ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। 

বাদামী দাগ রোগ:

লক্ষণ: পাতায় প্রথমে তিলের দানার মতো ছোট ছোট বাদামী দাগ হয়। ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠা গোলাকৃতি দাগের মাঝখানটা অনেক সময় সাদাটে ও কিনারা বাদামী রঙের হয়। একাধিক দাগ মিলে বড় দাগের সৃষ্টি হয়ে সমস্ত পাতাটিই দাগে পরিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে এবং গাছটিকে মেরে ফেলতে পারে।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • বীজতলা বা জমি সবসময় ভেজা বা স্যাঁতস্যাঁতে রাখা।

  • জমিতে পর্যাপ্ত পরিমানে নাইট্রোজেন ও পটাশ সার ব্যবহার করা।

  • পরিমানমতো  ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করলে এ রোগ আর বাড়তে পারেনা।

  • আক্রান্ত জমিতে ৬০ গ্রাম পটাশ ও ৬০ গ্রাম থিওভিট বা কমুলাস ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

 

টুংরো:

লক্ষণ: আক্রান্ত পাতা প্রথমে হালকা হলুদ এবং পরে গাঢ় হলুদ থেকে কমলা বর্ণেও হয়। কচি পাতাগুলো পুরাতন পাতার খোলের মধ্যে আটকে থাকে। পাতা ও কান্ডের মধ্যবর্তী কোণ বেড়ে যায় ও গাছ খাটো হয়। আক্রান্ত ধান গাছ পাকা পর্যন্ত বেচে থাকলে ও আক্রমন তীব্র হলে গাছ টান দিলে উঠে আসে এবং শুকিয়ে খড়ের মত হয়ে যায়। বিক্ষিপ্ত কিছু কিছু গাছে প্রথমে হলুদ হয়ে আক্রান্ত গুছির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • আলোর ফাঁদ ব্যবহার করে পাতা ফড়িং মেরে ফেলা (সবুজ পাতা ফড়িং এ ভাইরাসের বাহক)।

  • টুংরো আক্রান্ত জমির আশেপাশে বীজতলা করা থেকে বিরত রাখা।

  • হাতজালের প্রতি একশো টানে ৪০-৫০ টি সবুজ পাতা ফড়িং পাওয়া গেলে অনুমোদিত কীটনাশক (যেমন-সুমিথিয়ন ৫০ তরল প্রতি একরে ৪০০ মিলিলিটার হারে অথবা ফাইফানন ৫৭ তরল প্রতি একরে ৫০০ মিলিলিটার হারে) অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করা।

বাকানী ও গোড়া পঁচা:

লক্ষণ: এ রোগের স্পষ্ট লক্ষণ হলো আক্রান্ত ধানের চারা স্বাভাবিক চারার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ লম্বা হয়ে ফ্যাকাসে রং ধারণ করে। আক্রান্ত চারার পাতা হলদে সবুজ হয়। আক্রান্ত চারাগুলো বেশিদিন বাঁচেনা। আক্রান্ত কুশি লিকলিকে হয়। এদের ফ্যাকাসে সবুজ পাতা অন্যান্য গাছের উপর দিয়ে দেখা যায়। নিচের দিকে গিটে অস্থানিক শিকড় ও দেখা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষণ হলো গোড়া পঁচা।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • মাঠে বাকানী দেখা দিলে জমি থেকে তুলে সে স্থানে অন্য সুস্থ গাছ লাগানো।

  • গোড়া পঁচা দেখার সাথে সাথে জমি শুকিয়ে ফেলা।

  • বীজতলা হিসেবে একই জমি ব্যবহার না করা।

  • বীজতলায় পানি ধরে রাখা।

ব্লাষ্ট রোগ:

লক্ষণ: পাতা, কান্ড ও শীষ আক্রান্ত হয়। প্রথমে পাতায় ডিম্বাকৃতির দাগ পড়ে যার দু প্রান্ত লম্বা হয়ে চোখাকৃতি ধারণ করে। দাগের মধ্যভাগ ছাই রংয়ের ও বাইরের দিকের প্রান্ত গাঢ় বাদামী হয়। অনেকগুলি দাগ একত্রে মিলে পাতাটি মরে যেতে পারে।

দমন ব্যবস্থাপনা:

  • সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা।

  • জমিতে সব সময় পানি রাখা।

  • কুশি অবস্থায় রোগটি দেখা দিলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করে সেচ দেওয়া।

আক্রমন বেশি হলে প্রপিকোনাজল বা ট্রাইসাইক্লোজল ছত্রাকনাশক (ফিলিয়া ২৫ ইসি প্রতি একরে ৪০০ মিলিলিটার হারে) স্প্রে করতে হবে।

তথ্য: 
তথ্য আপা প্রকল্প